ভোলা জেলার উপকূলীয় চর এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুতো শিক্ষক স্বল্পতায় শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার চরফ্যাশন উপজেলার নজরুলনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ কলমী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৫২ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। তাঁদের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তাঁকে সপ্তাহে কয়েকবার চরফ্যাশন সদরে বিভিন্ন সভায় যোগ দিতে যেতে হয়। ফলে প্রায় পুরো সপ্তাহেই কোলের শিশুকে নিয়ে একাই ক্লাস নিতে হয় সহকারী শিক্ষক দ্বীনা বেগমকে।
অনেক বছর ধরে তিনজন শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে চলছিল বিদ্যালয়টি। কিন্তু ২০২৪ সালে একই সময়ে তিনজন শিক্ষকের একজন অবসরে যান এবং আরেকজন, দ্বীনা বেগম, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান। তখন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র অধিকারী কার্যত বড় সংকটে পড়েন। সেই সময় থেকেই তিনি উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে শিক্ষক চেয়ে আবেদন জানিয়ে আসছেন। একাধিকবার দাবি জানালেও এখনো নতুন শিক্ষক পাননি। শুধু দক্ষিণ কলমী নয়, চরফ্যাশন উপজেলার গ্রাম ও চরাঞ্চলে অবস্থিত বেশির ভাগ বিদ্যালয়ের চিত্র প্রায় একই। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জেলায় প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে মোট ৭১৫টি পদ শূন্য রয়েছে, যার মধ্যে ৪৩৬টি সহকারী শিক্ষকের। অধিকাংশ শূন্যপদই গ্রাম ও চরাঞ্চলে। জেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ১ হাজার ৪৬টি এবং সহকারী শিক্ষকের পদ ৫ হাজার ৪৫৬টি। এ বছর সরকার চরফ্যাশন উপজেলায় ৪১ জন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে। কিন্তু এবারও তাঁর বিদ্যালয়ে শিক্ষক মিলবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন দক্ষিণ কলমী বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র অধিকারী। তাঁর ভাষ্য, অনেকেই তদবির করে শহর বা শহরের কাছাকাছি বিদ্যালয়ে থেকে যান। গ্রামের দুর্গম বিদ্যালয়ে কেউ যেতে চান না। তিনি সরকারের কাছে অন্তত দুজন শিক্ষক দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। উপজেলার আমিনপুর কুকরিমুকরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ ছয়টি পদের মধ্যে চারটি শূন্য। পূর্ব ফরিদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি পদের মধ্যে শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। দক্ষিণ কুকরিমুকরি এ রাজ্জাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি পদের মধ্যে চারটি এবং চর মোতাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টির মধ্যে তিনটি পদ শূন্য রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চরফ্যাশন উপজেলার ৬৩টি বিদ্যালয়ে ৩৫ জন প্রধান শিক্ষক ও ৮৯ জন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য আছে। এর মধ্যে অনেক শিক্ষক আগে থেকেই বদলি হয়ে আছেন। কিন্তু নতুন শিক্ষক না আসায় তাঁরা কাঙ্ক্ষিত বিদ্যালয়ে যোগ দিতে পারছেন না। শহরের স্কুলে শিক্ষক তুলনামূলক বেশি। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একজন শিক্ষকের অধীনে ৪০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা। কিন্তু চরফ্যাশনের দুর্গম গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোয় এই অনুপাত মানা হচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে শহরের বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক তুলনামূলক বেশি, অথচ শিক্ষার্থী কম। জেলার সাতটি উপজেলায় শহরে অবস্থিত অন্তত ২০টি স্কুলে শিক্ষার্থীর অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা বেশি রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। চরফ্যাশন উপজেলার অন্তত ১৫ জন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপজেলা শহরের অন্তত ছয়টি বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক আছেন। প্রভাবশালীরা তদবির করে সেখানে আত্মীয়স্বজনদের পদায়ন করিয়ে রাখছেন। শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর জেলায় নতুন করে ২৫৬ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার খবর শুনে প্রথমে আশার সঞ্চার হয়েছিল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার কারণে সেই আশায় আবারও অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে। অনেকের প্রশ্ন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা কি সত্যিই দুর্গম বিদ্যালয়গুলোয় যোগ দেবেন, নাকি আগের মতো তদবিরের জোরে উপজেলা শহরঘেঁষা বিদ্যালয়েই পদায়ন হবে?
জানতে চাইলে ভোলা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিও) আমিনুল ইসলাম বলেন, যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তাঁদের অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক পদায়ন করা হবে। এর বাইরে কোনো অনিয়ম হবে না। গ্রামের এক শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতিবছরই দেখি নতুনরা মামা-খালুর জোরে পছন্দের স্কুলে যোগ দেয়। আর আমাদের স্কুলে বছরের পর বছর পদ শূন্য পড়ে থাকে।’ এ অবস্থার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি পাস করেও নিজের নাম ঠিকমতো লিখতে পারে না। কারণ, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তাদের শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে। দুর্গম এলাকার অভিভাবকেরা বলছেন, শহরে পড়াশোনা না হলে শিশুরা পরিবারের সদস্য বা প্রাইভেট শিক্ষকের সাহায্য পেতে পারে। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র পরিবারে সে সুযোগ নেই। অধিকাংশ অভিভাবক জেলে, কৃষক বা দিনমজুর হওয়ায় তারা পুরোপুরি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে সপ্তাহে দু-তিন দিন কোনোভাবে ক্লাস চলে।

সাব্বির আলম বাবু 



















