ভাড়া চূড়ান্ত না হওয়া এবং যাত্রী সংকটে ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদের উদ্বোধনী যাত্রা বাতিল হয়েছে। পর্যটন সার্ভিস হিসেবে গতকাল স্টিমারটির ঢাকা-বরিশাল নৌপথে আনুষ্ঠানিক যাত্রার ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)।
গত ১৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় শতবর্ষী এ জাহাজটি। বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার ঢাকা থেকে বরিশাল ছেড়ে যাবে নৌযানটি।বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা বৈঠক হলেও প্যাডেল স্টিমারের ভাড়া নির্ধারণ করা যায়নি। আগাম টিকিট বুকিংও আশানুরূপ হয়নি। মাত্র তিন-চারজন যাত্রী বুকিং করায় উদ্বোধনী যাত্রা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।
শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমারটি ফিটনেস সনদ ও গেজেট ছাড়াই চালানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নৌযানটি পানিতে ভাসানো হয়েছে বলে দাবি নৌ আইন বিশ্লেষকদের।
শিগগিরই জাহাজটি বেসরকারি পর্যটন খাতে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিচালনাকারী সংস্থা বিআইডব্লিউটিসি। এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিসির একটি সূত্র জানায়, ‘ঢাকা-বরিশাল রুট অনেক দীর্ঘ পথ, এত দূরের পথ ভ্রমণ করার সক্ষমতা জাহাজটির নেই। এ কারণে ২১ নভেম্বর প্রথম যাত্রায়ও আমাদের টার্গেট ছিল জাহাজটি চাঁদপুর টার্মিনালে বেশ কিছুক্ষণ বিরতি দেয়ার পর বরিশালের উদ্দেশে পুনরায় যাত্রা করবে। পরবর্তী সময়ে নৌযানটি বেসরকারি পর্যটন শিল্পের কাছে দেয়া হবে। এরই মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২৬ নভেম্বর সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে জাহাজটি বুঝিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’
সূত্র আরো জানায়, বিনিয়োগকারীদের ভাষ্য, ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচল করে জাহাজটি দিয়ে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়। তবে এটি ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ-চাঁদপুর অথবা পদ্মা সেতুর আশপাশে দিনব্যাপী বা অর্ধদিন চালাতে পারলে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। এতে পর্যটন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ দুই উদ্দেশ্যই সফল হবে। বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবের আলোকেই সরকার বিভিন্ন শর্ত বেঁধে দেবে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, গতকাল পিএস মাহসুদের প্রথম যাত্রার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত বৈধ যাতায়াতের অনুমতি মেলেনি নৌযানটির। এ নিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বণিক বার্তাকে জানায়, এর আগেও সরকার শতবর্ষী নৌযানটি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দুই ট্রিপ চালানোর পর নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের (ডিওএস) আপত্তির কারণে চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এছাড়া, জাহাজটি বন্ধ করার পেছনে যাত্রী সংকট ও অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের বিষয়টিও ছিল বলে জানায় সূত্র।
তিন বছর বন্ধ থাকার পর নৌ-পরিবহন উপদেষ্টার আগ্রহে বিআইডব্লিউটিসি নতুন করে শতবর্ষী নৌযানটি চালানোর উদ্যোগ নেয়। এজন্য ডিওএসের কাছে পিএস মাহসুদের ফিটনেস-সংক্রান্ত সনদ চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। ডিওএস নৌযানটিতে ২১ ধরনের ত্রুটির বিষয়ে উল্লেখ করে বিআইডব্লিউটিসিকে অবহিত করে।
পরে বিআইডব্লিউটিসি ত্রুটিগুলো সংশোধন করে জাহাজটির ফিটনেস ও চলাচলের অনুমতি চেয়ে ডিওএসের কাছে পুনরায় চিঠি লেখে। ডিওএসের ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মোহাম্মদ এহতেছানুল হক ফকির জাহাজটির বিস্তারিত খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে গত ২৩ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটিতে যেসব ত্রুটি রয়েছে তার বেশির ভাগই সংশোধন করা হয়েছে। তবে নৌযানটির নেভিগেশন ইকুইপমেন্ট, সেফটি অ্যান্ড ফায়ার ফাইটিং, লাইভ সেভিং ইকুইপমেন্ট, স্ট্রাকচার (হাল কন্ডিশন) ত্রুটি সার্টিফিকেশন ও সরকারি ফি-গুলো বার্ষিক সার্ভের সময় চেক করা হয়ে থাকে। কিন্তু ওই নৌযানটির অনেক দিন যাবত হালনাগাদ সার্ভে সদন নেই।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নৌযানটির নির্মাণকাল ১৯২৩, কলকাতা। দ্য ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ (আইএসও)-এর বিধি ৩০(১) অনুযায়ী নৌযানটির ৪০ বছরের অধিক বয়স হওয়ায় চলাচলের অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার, সদরঘাট, ঢাকা ওই নৌযানটি চলাচলের অনুমতি দিতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে নৌযানটি চলাচলের উপযোগী হলেও নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বা নির্দেশনা প্রয়োজন।
নৌ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কপথে চলাচলের জন্য যেমন বিআরটিএ থেকে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস নিতে হয়, তেমনি নৌপথে চলাচলের জন্য ডিওএস থেকে নৌযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ নিতে হয়। সড়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা অথবা সচিবের মৌখিক বা লিখিত কোনো নির্দেশে যেমন কোনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বা ফিটনেস সনদ হয় না, তেমনি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কিংবা অন্য কোনো কর্মকর্তার লিখিত বা মৌখিক নির্দেশে নৌযানের রেজিস্ট্রেশন বা ফিটনেস দেয়ার সুযোগ নেই। ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশন দেয়ার একমাত্র অথরিটি নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর।
এ নিয়ে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান বলেন, ‘আমরা নৌযানটি সার্ভে করেছি। এটি চলাচল উপযোগী। তবে শতবর্ষী হওয়ায় আইন অনুযায়ী চলাচলের অনুমতি দেয়া যায় না। যেহেতু নৌযানটি ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যের অংশ, তাই আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চেয়েছি কীভাবে এর ফিটনেস দেয়া যায়। এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা এখনো আমরা পাইনি।’

সাব্বির আলম বাবু 



















