ঢাকা , শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
আদানির ইউনিট বন্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংকটে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং, ছুটির দিনেও চরম ভোগান্তি গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ট্যাংক দুর্ঘটনায় আহত ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিনকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী মোরেলগঞ্জে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে চেয়ারম্যান প্রার্থীর মতবিনিময় সভা পিরোজপুর সদরকে শিশুশ্রম ও ঝরে পড়া শিশুমুক্ত উপজেলা ঘোষণা পিরোজপুরে তার কাটার সময় যুবক আটক, বিভিন্ন মালামাল উদ্ধারের দাবি ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের ক্যানসারে মারা গেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা: শেষকৃত্যে যোগ দিতে ৫ ঘণ্টার প্যারোল পিরোজপুরে তামাক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা বাস্তবায়নে কর্মশালা মহিলা দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাগেরহাটে আলোচনা সভা

অবরোধের সুফল সুন্দরবনে: নির্ভয়ে ঘুরছে বন্যপ্রাণী, মিলছে বাঘ-হরিণ-কুমিরের দেখা

 

তিন মাসের অবরোধে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে সজীবতা ফিরে এসেছে। মানুষের আনাগোনা ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকায় নির্ভয়ে বিচরণ করছে বাঘ, হরিণ, কুমির, বানর, বন্য শূকর ও লাল কাঁকড়াসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। ঘন হয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ।

বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং বন্য ও জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ ও সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আবারও সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন পর্যটক, জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা। ৩ মাসের এই অবরোধের সুফল দৃশ্যমান হয়েছে বলে দাবি করছে বন বিভাগ।

অবরোধ চলাকালে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। কখনো খালের পাড়ে, আবার কখনো বনের ভেতরে বাঘের উপস্থিতি নজরে এসেছে। পর্যটকদের মন কেড়েছে কুমিরের শিকার ধরার দৃশ্য। বনের নানা প্রান্তে হরিণের পাল, বানর, লাল কাঁকড়া ও বন্য শূকরের অবাধ বিচরণ দেখা যাচ্ছে।

বন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন মাস মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণীরা নির্ভয়ে চলাচলের সুযোগ পেয়েছে। একই সময়ে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজননও হয়েছে নির্বিঘ্নে। ফলে বনের খালগুলোতে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে অবরোধ চলাকালে বনজ অপরাধের আশঙ্কা থাকায় বন বিভাগকে টহল জোরদার করতে হয়েছিল। জোয়ার-ভাটার সময় হিসাব করে ২৪ ঘণ্টাই পাহারা দিয়েছেন বনকর্মীরা। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, “অবরোধ বাস্তবায়নে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ সময়ে বনজ অপরাধ কমেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। হরিণের পালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালের পাড়ে বাঘের উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে।”

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে মাসে সাত দিন স্মার্ট পেট্রোলিং করা হলেও তিন মাসের অবরোধ চলাকালে তা বাড়িয়ে ২০ দিন করা হয়। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এদিকে অবরোধ শেষ হওয়ায় সুন্দরবনে যাওয়ার প্রস্তুতি শেষ করেছেন উপকূলের জেলেরা। নৌকা ও জাল মেরামত, প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহসহ সব কাজ প্রায় শেষ। দীর্ঘ তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার খাল ও নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।

শরণখোলার জেলে আলাল মোড়ল বলেন, “তিন মাস বনে যেতে পারিনি। নৌকা-জাল মেরামত করে রেখেছি। এতদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার বনে গেলে ভালো মাছ পাব বলে আশা করছি। মাছ ভালো পাওয়া গেলে আমাদের মতো বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা কমবে।”

শুধু জেলে নয়, বনের ওপর নির্ভরশীল মৌয়ালরাও অপেক্ষায় রয়েছেন বনে ফেরার। শরণখোলার মৌয়াল জীবন কর্মকার বলেন, “তিন মাস বনে যেতে না পারায় আমাদের সংসারে টানাটানি গেছে। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার প্রধান ভরসা। বন থেকে সম্পদ নিতে গিয়ে যেন বনের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।”

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা জরুরি। এতে বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন নিশ্চিত হয়।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। এবারও অবরোধের সুফল হিসেবে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে।

সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ১৪টি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবছর এসব পর্যটনকেন্দ্রে কয়েক লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি নির্ধারিত ফি দিয়ে বছরে প্রায় অর্ধলাখ বনজীবী সুন্দরবন থেকে মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ করেন।

উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে আসছে বন বিভাগ।

জনপ্রিয়

আদানির ইউনিট বন্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংকটে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং, ছুটির দিনেও চরম ভোগান্তি

অবরোধের সুফল সুন্দরবনে: নির্ভয়ে ঘুরছে বন্যপ্রাণী, মিলছে বাঘ-হরিণ-কুমিরের দেখা

আপডেট : ০৪:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

 

তিন মাসের অবরোধে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে সজীবতা ফিরে এসেছে। মানুষের আনাগোনা ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকায় নির্ভয়ে বিচরণ করছে বাঘ, হরিণ, কুমির, বানর, বন্য শূকর ও লাল কাঁকড়াসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। ঘন হয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ।

বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং বন্য ও জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ ও সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আবারও সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন পর্যটক, জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা। ৩ মাসের এই অবরোধের সুফল দৃশ্যমান হয়েছে বলে দাবি করছে বন বিভাগ।

অবরোধ চলাকালে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। কখনো খালের পাড়ে, আবার কখনো বনের ভেতরে বাঘের উপস্থিতি নজরে এসেছে। পর্যটকদের মন কেড়েছে কুমিরের শিকার ধরার দৃশ্য। বনের নানা প্রান্তে হরিণের পাল, বানর, লাল কাঁকড়া ও বন্য শূকরের অবাধ বিচরণ দেখা যাচ্ছে।

বন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন মাস মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণীরা নির্ভয়ে চলাচলের সুযোগ পেয়েছে। একই সময়ে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজননও হয়েছে নির্বিঘ্নে। ফলে বনের খালগুলোতে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে অবরোধ চলাকালে বনজ অপরাধের আশঙ্কা থাকায় বন বিভাগকে টহল জোরদার করতে হয়েছিল। জোয়ার-ভাটার সময় হিসাব করে ২৪ ঘণ্টাই পাহারা দিয়েছেন বনকর্মীরা। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, “অবরোধ বাস্তবায়নে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ সময়ে বনজ অপরাধ কমেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। হরিণের পালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালের পাড়ে বাঘের উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে।”

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে মাসে সাত দিন স্মার্ট পেট্রোলিং করা হলেও তিন মাসের অবরোধ চলাকালে তা বাড়িয়ে ২০ দিন করা হয়। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এদিকে অবরোধ শেষ হওয়ায় সুন্দরবনে যাওয়ার প্রস্তুতি শেষ করেছেন উপকূলের জেলেরা। নৌকা ও জাল মেরামত, প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহসহ সব কাজ প্রায় শেষ। দীর্ঘ তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার খাল ও নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।

শরণখোলার জেলে আলাল মোড়ল বলেন, “তিন মাস বনে যেতে পারিনি। নৌকা-জাল মেরামত করে রেখেছি। এতদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার বনে গেলে ভালো মাছ পাব বলে আশা করছি। মাছ ভালো পাওয়া গেলে আমাদের মতো বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা কমবে।”

শুধু জেলে নয়, বনের ওপর নির্ভরশীল মৌয়ালরাও অপেক্ষায় রয়েছেন বনে ফেরার। শরণখোলার মৌয়াল জীবন কর্মকার বলেন, “তিন মাস বনে যেতে না পারায় আমাদের সংসারে টানাটানি গেছে। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার প্রধান ভরসা। বন থেকে সম্পদ নিতে গিয়ে যেন বনের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।”

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা জরুরি। এতে বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন নিশ্চিত হয়।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। এবারও অবরোধের সুফল হিসেবে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে।

সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ১৪টি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবছর এসব পর্যটনকেন্দ্রে কয়েক লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি নির্ধারিত ফি দিয়ে বছরে প্রায় অর্ধলাখ বনজীবী সুন্দরবন থেকে মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ করেন।

উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে আসছে বন বিভাগ।