বাগেরহাটের পলি ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটারে নাসিমা আক্তার নামের এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। বুধবার (১২ আগস্ট) বাগেরহাটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মাহাবুবুল আলম।
কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন—বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. মো. ফারুকুজ্জামান এবং অ্যানেস্থেশিয়া বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. এসকেন্দার। এই কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে বাগেরহাট শহরের পুরাতন বাজার এলাকায় অবস্থিত পলি ক্লিনিকে পিত্তথলিতে পাথর অস্ত্রোপচারের পর অপারেশন থিয়েটারেই মারা যান নাসিমা আক্তার (২০) নামের এক রোগী। নিহত নাসিমা আক্তার বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বারোদাঁড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ও সমান হাওলাদারের স্ত্রী।
স্বজনদের অভিযোগ ছিল, রাত চারটার দিকে অপারেশন থিয়েটারেই মৃত্যু হয় নাসিমা আক্তারের। বিষয়টি নিয়ে রোগীর স্বজনরা ক্লিনিকের সামনে ও ভেতরে বেশ হট্টগোল করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহতের পরিবারকে হট্টগোল ও অভিযোগ না করার জন্য বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। শেষ পর্যন্ত নিহতের পরিবারের সদস্যরা কোনো প্রকার লিখিত অভিযোগ ছাড়াই দুপুরের দিকে মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যান।
এদিকে গত ৮ আগস্ট শহরের দাসপাড়া মোড় এলাকার ‘দবির উদ্দিন মেমোরিয়াল ক্লিনিক’-এ এক নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দুই সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন সিভিল সার্জন। কমিটির সদস্যরা হলেন—বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. শিহান মাহমুদ ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. শেখ রিয়াদুজ জামান।
মৃত নবজাতকের বাড়ি কচুয়া উপজেলায়। মৃত্যুর পর নিহতের নানি আমেনা বেগম (বা আমিনুর বেগম) অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর মেয়ে নাদিরা বেগমকে ৭ আগস্ট দিবাগত রাতে দবির উদ্দিন মেমোরিয়াল ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। গভীর রাতে স্বাভাবিকভাবে (নরমাল ডেলিভারি) তাঁর মেয়ের বাচ্চা হয়। কিন্তু সকালে বাচ্চা কান্নাকাটি করলে তা চিকিৎসক ও নার্সদের জানানো হয়; তবে তাঁরা বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দেননি।
পরে শিশুটি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্লিনিকের মালিক ও সার্জন ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশুটিকে স্থানীয় অনিল কুন্ডু নামের এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে বলেন। সেখানে নিয়ে গেলে চিকিৎসক অনিল কুন্ডু বলেন, “এখানে কেন নিয়ে এসেছেন? বাচ্চাকে তো অক্সিজেন দিতে হবে, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।” শিশুটিকে পুনরায় ক্লিনিকে ফিরিয়ে আনা হলে কর্তৃপক্ষ অক্সিজেন প্রয়োগ করে, কিন্তু ততক্ষণে শিশুটির মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের অবহেলাতেই ওই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন আমেনা বেগম।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নবজাতককে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হলেও শিশুর পরিবারকে ৬ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনকি ৬ হাজার টাকা না দিলে মরদেহ নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ৩ হাজার টাকা দিয়ে রফাদফা করেন মৃত নবজাতকের নানি। বিষয়টি জানাজানি হলে সিভিল সার্জন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মাহাবুবুল আলম বলেন, “পলি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেস্থেশিয়া টিমে যাঁর থাকার কথা ছিল, সেই অ্যানেস্থেটিস্ট জাহিদ হোসেন দাবি করেছেন তিনি সেদিন সেখানে ছিলেন না। এছাড়া সেখানে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিউটি ডাক্তারও ছিলেন না। নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি; তারা প্রতিবেদন দিলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সিভিল সার্জন আরও জানান, দবির উদ্দিন মেমোরিয়াল ক্লিনিকে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানেও অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ 



















