প্রতীকী ছবি
একটি সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো নারী অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের জীবনের সার্বিক নিরাপত্তা। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ও নিরাপত্তার স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও, দৈনন্দিন বাস্তবতায় নারী নিরাপত্তা আজ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নারীর ওপর সহিংসতা রোধ ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ কেবল নারী সমাজের দাবি নয়, এটি সময়ের আবশ্যিক প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে প্রবাসী আয়, কৃষিকাজ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অবদান অনস্বীকার্য। তা সত্ত্বেও ঘরে, বাইরে, গণপরিবহনে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে হাজার হাজার নারী পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও সাইবার অপরাধের শিকার হন। ভার্চুয়াল জগতের প্রসারের সাথে সাথে ডিজিটাল মাধ্যমে নারী নিপীড়নের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা নারী অগ্রযাত্রার গতিকে থমকে দিচ্ছে।
নারী নিরাপত্তাহীনতার মূলে রয়েছে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, শিক্ষার নিম্নহার, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। আইনি কাঠামো বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও—যেমন ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ এবং ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০’—প্রয়োগের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে ভুক্তভোগীরা প্রায়শই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবেদনশীলতার অভাব এবং ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার (Victim Blaming) সামাজিক প্রবণতাও অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে প্রথমেই কর্মক্ষেত্রে ও জাতীয় পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন সত্ত্বেও কর্মসংস্থানে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য এখনও দৃশ্যমান। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট (Global Gender Gap Report) অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান দূর করতে এখনও বহু পথ বাকি। এর পাশাপাশি পারিবারিক সম্পত্তি উত্তরাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত না করা পর্যন্ত বৈষম্যের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
এ সংকট দূরীকরণে সমন্বিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি–আইনের কঠোর প্রয়োগ; আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা; শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা; সুরক্ষিত অবকাঠামো; অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা।
নারী কেবল একটি পরিবার বা সমাজের অংশ নন, তিনি দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ। অর্ধেক জনসংখ্যাকে নিরাপত্তাহীনতায় রেখে কিংবা বৈষম্যের শিকার বানিয়ে কোনো দেশ চূড়ান্ত সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। নারীর নিরাপত্তা রক্ষা ও বৈষম্য দূরীকরণ কোনো দয়াদাক্ষিণ্য নয়, এটি নারীর মৌলিক মানবাধিকার।
আসুন, আইন প্রয়োগের কঠোরতা, সামাজিক আন্দোলন এবং মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে নারী-পুরুষের জন্য একটি নিরাপদ, সাম্যবাদী ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

ডেস্ক রিপোর্টঃ 



















