রমজানের ২০তম রোজা। নাটোর শহর জুড়ে ঈদের আমেজ জমে উঠেছে। সকাল হতেই শহরের মার্কেটগুলোতে মানুষের ঢল। কেউ নতুন জামা কিনছে, কেউ মায়ের জন্য শাড়ি। শহরের রাস্তা, অলিগলি—সব জায়গা যেন উৎসবের রঙে ভরপুর। কিন্তু সেই উৎসবের ভিড়ের আড়ালেই ঢুকে পড়েছে একদল অচেনা অতিথি। এরা অতিথি নয়, বরং পেশাদার অপরাধী চক্র। এদের মূল লক্ষ্য—ভিড়ের মধ্যে ঢুকে মানুষের কষ্টার্জিত টাকা-পয়সা, মোবাইল, এমনকি বাচ্চার গলার সোনার হারও কেড়ে নেওয়া।
নাটোর জেলা পুলিশের কাছে গোপন সূত্রে খবর আসে—”নতুন চক্র এসেছে শহরে।” পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন মিটিং ডাকলেন। নির্দেশ সোজা—এই ‘অতিথিদের’ অপকর্ম রুখতেই হবে।
ডিবি নাটোরের ইনচার্জ মোঃ হাসিবুল্লাহ হাসিব টিমের সবাইকে ডেকে বললেন,”বন্ধুরা, নাটোরের মানুষ আমাদের বিশ্বাস করে। ঈদের বাজারে কোনো চোরচক্র যদি কাউকে সর্বস্বান্ত করে, সেটা আমাদের ব্যর্থতা। এবার কোনো ছাড় নেই!”
পরিকল্পনা চূড়ান্ত। ইন্সপেক্টর নজরুলের নেতৃত্বে কয়েকটি টিম ভাগ হলো। পোশাকে এবং ছদ্মবেশে। ডিবি নারী সদস্যদেরও রাখা হলো বিশেষ নজরদারিতে।
সকাল ১১টায় মাঠে নামল তারা। মার্কেটের ভিড়ের মধ্যে সদস্যরা নিজের চোখেই দেখলেন—দুজন নারী ঘোরাঘুরি করছে, সঙ্গে একটা ছোট বাচ্চা। কিন্তু তাদের চোখ আর হাবভাব অন্যরকম।
ইন্সপেক্টর নজরুল ফোন করলেন, “স্যার, টার্গেট পেয়ে গেছি। অপারেশন শুরু করছি।” নারী সদস্য তারাশী আর ডিবি সদস্য ফটিক দ্রুত সামনে এগিয়ে গেল। এক পর্যায়ে সেই নারীদের একজন ব্যাগ কাটতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে। তারাশী জাপটে ধরে ফেলল। অন্যজন পালানোর চেষ্টা করলেও ফটিক থামিয়ে দিল। তাদের ডিবি অফিসে নিয়ে আসা হলো। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এলো বিস্ময়কর সব তথ্য।
নামের পেছনে পরিচয়ের গল্প—
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেলিনা আক্তার ওরফে জোসনা, বেদে সম্প্রদায়, সুবর্ণা আক্তার চাঁদনী, এলেনা ও বগুড়ার জাকিয়া টুনটুনি চিহ্নিত অপরাধী। আর বোনাস হিসেবে পাওয়া গেল সেই শিশুটি, যে ছিল তাদের ঢাল। শিশুটিকে সামনে রেখে এরা মানুষকে বিভ্রান্ত করত। সন্দেহ হলে কান্নাকাটি শুরু করত।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, এরা গত ৭ দিন ধরে নাটোর শহরে ছিল। বেশ কয়েকজন নারীর ব্যাগ কেটেছে। এক বৃদ্ধা মায়ের কাছে শেষ সম্বলটাও তারা কেড়ে নিয়েছে।
ডিবি ইনচার্জ হাসিব বললেন, “আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো মায়া দেখানো হবে না। নাটোরের মানুষের কষ্টের টাকা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”
ইন্সপেক্টর নজরুলের টিম মামলা রুজু করল। আদালতে পাঠানোর ব্যবস্থা হলো। শিশুটির বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হলো।
সারা দিনের ব্যস্ততার পর ডিবি অফিসে একসঙ্গে ইফতার। ইফতার শেষে হাসিব বললেন, “এই শহর আমাদের। ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতে আসা মানুষগুলো যেন নিরাপদ থাকে—এটাই আমাদের ঈদ উপহার।”
তিনি নাটোরবাসীকে সতর্ক করলেন, “অপরিচিত অতিথিদের সাবধানে দেখবেন। পুলিশ, ডিবি, প্রশাসন আপনাদের পাশে আছে। আসুন, সবাই মিলে নিরাপদ ঈদ উদযাপন করি।”

আব্দুল মজিদ, নাটোরঃ 


















