বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ভোলার অর্ধশতাধিক দুর্গম চরাঞ্চলের তিন লাখের বেশি মানুষ। পর্যাপ্ত কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় জনবল ও ওষুধের সংকটে এসব এলাকার মানুষ পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নদীপথে উপজেলা সদরে নেওয়ার আগেই অনেক সময় ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। তাই চরাঞ্চলে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চর বৈরাগী। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় আগে জেগে ওঠা এই চরে বসতি গড়ে তুলেছেন কয়েক হাজার মানুষ। কিন্তু মানুষের বসতি বাড়লেও বাড়েনি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র, নেই নিয়মিত চিকিৎসক কিংবা ওষুধের ব্যবস্থা। অসুস্থ হলে চরবাসীর ভরসা স্থানীয় কয়েকটি ফার্মেসি আর হাতুড়ে চিকিৎসা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে আছেন উপকূলীয় জেলা ভোলার চরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ। জেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত ছোট-বড় অর্ধশতাধিক চরে এসব মানুষের বসবাস। কিন্তু দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে মৌলিক চিকিৎসাসেবাই যেন তাদের কাছে দুর্লভ।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি ৬ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও ভোলার অনেক চরেই নেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কোথাও কোথাও স্থাপনা থাকলেও নিয়মিত সেবা, জনবল ও ওষুধের সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েন গর্ভবতী নারী ও শিশুরা। প্রসবকালীন জটিলতা কিংবা গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
চরের শিক্ষক ইয়ানুর বেগম জানান, “আমাদের চরে যারা বসবাস করে তারা খুবই অসহায়। চরের বেশির ভাগ গর্ভবতী মাকে চিকিৎসার জন্য অনেক কষ্ট পেতে হয়। চরে কোনো সেবাই পাওয়া যায় না। একটা ক্লিনিক থাকলে অন্তত কিছু ওষুধ বা প্রাথমিক সেবা পাওয়া যেত। এখন সেবা না পাওয়ায় ব্যথা উঠলে কয়েক দিন কষ্ট ভোগ করতে হয়, তারপর হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাও জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়। নিলে আল্লাহর হুকুম থাকলে বাঁচে, না হয় পথেই মারা যায়। সব প্রসূতিকে কি আর বাঁচিয়ে রাখা যায়?”
চর বৈরাগীর গৃহিণী রেহানা বেগম বলেন, “চরে ক্লিনিক না থাকায় আমাদের অনেক দূরের পথ হেঁটে গিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়। বয়স্ক বাবা-মা অসুস্থ হলে আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করে বসে থাকি। টাকা জোগাড় করে ট্রলারে করে ওপারে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করাই। এছাড়া আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। চরে সেবা বলতে কিছুই নেই; হাসপাতাল নেই, ক্লিনিকও নেই।”
গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, “আমাদের চরে কোনো ডাক্তার নেই, তাই আমরা কোনো চিকিৎসা নিতে পারি না। বাচ্চাদের কোনো অসুখ হলেও ডাক্তার দেখাতে পারি না, ঘরে ফেলে রাখতে হয়। আমাদের অনেক কষ্ট। ওপারে খেয়া দিয়ে পার হতে একদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। চরে অন্তত একটা কমিউনিটি ক্লিনিক দরকার।”
আরেক বাসিন্দা ফাতেমা বলেন, “আমরা চরের মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকি। কেউ অসুস্থ হলে ভালো কোনো সেবা পাওয়া যায় না। রাতে কারও শারীরিক ব্যথা বা অসুস্থতা বাড়লে ভুগে মারা যেতে হয়, আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া উপায় থাকে না। সেবা নিতে হলে ভোলা সদরে যেতে হয়, তাও দ্রুত যাওয়া যায় না। জোয়ার ও খেয়ার ওপর নির্ভর করে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে হয়। কিছুদিন আগে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই এক প্রসূতি নারী মারা গেছেন।”
বৃদ্ধ আলী আজগর আফসোস করে বলেন, “আমরা চরের মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা ভোট দিয়ে এমপি-চেয়ারম্যান বানাই, অথচ রাতে কেউ অসুস্থ হলে একটা স্পিডবোট পর্যন্ত পাওয়া যায় না, যা দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাব। দয়া করে চরের মানুষের কথা চিন্তা করে ডাক্তার, ক্লিনিক ও ওষুধের ব্যবস্থা করে দিন।”
একই চিত্র ভোলার দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, মনপুরা ও সদর উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংকটের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসক, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি। কোথাও কোথাও ওষুধ সরবরাহও প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
মদনপুর চরের জনপ্রতিনিধি জামাল উদ্দিন বলেন, “আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন বলেই চরের মানুষ টিকে আছে। এই চরে গুটিকয়েক ফার্মেসিতে কিছু ট্যাবলেট বা বড়ি বিক্রি ছাড়া ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা চরে একটি স্থায়ী ক্লিনিকের দাবি জানাচ্ছি, যাতে চরবাসী সবসময় চিকিৎসাসেবা পায়।”
দৌলতখান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন, “চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার মূল কারণ হলো জনবল, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া। বিষয়টি নিয়ে আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করেছি। আশা করছি দ্রুতই জনবল সংকট দূর হবে। চরে আরও ক্লিনিক স্থাপন করা হলে সেবা দেওয়া সহজ হবে।”
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. অচিন্ত কুমার ঘোষ বলেন, “ভোলা নদী ও চারদিকে পানিবেষ্টিত একটি দ্বীপ জেলা। এর মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো চরাঞ্চল, যেখান থেকে রোগীরা সহজে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে পারেন না। আমরা যদি চরাঞ্চলে সরাসরি সেবা দিতে পারতাম, তবে মানুষ উপকৃত হতো। আমাদের বেশ কিছু রিমোট বা দুর্গম এলাকায় এফডব্লিউসি (FWC) বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। সরকার যদি এসব চরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করে জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়, তবে সাধারণ জনগণ অনেক উপকৃত হবে।”

সাব্বির আলম বাবুঃ 



















