বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদান কার্যক্রমের আওতায় এখন পর্যন্ত ১৪টি দেশের ৫৪ হাজার ৪৭৭ জন প্রবাসীকে এনআইডি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ হাজারের বেশি স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট করে সংশ্লিষ্ট দেশের মিশনগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি অনুবিভাগের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান।
ইসির এনআইডি শাখার আগস্ট মাসের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনের মাধ্যমে মোট ৯৯ হাজার ৮১৫টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৬২ হাজার ৫৮বণ জনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, রেজিস্ট্রেশন অফিসারের তদন্ত সম্পন্ন হয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে ৩ হাজার ৫৩৬টি আবেদন। অন্যদিকে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে ৫৪ হাজার ৪৭৭টির এবং তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বাতিল হয়েছে ২৬ হাজার ৫৯৫টি আবেদন।
আবেদনের প্রায় ৬৩ শতাংশের বায়োমেট্রিক সম্পন্ন
বিদেশে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমে পাওয়া ৯৯ হাজার ৮১৫টি আবেদনের মধ্যে ৬২ হাজার ৫৮৯টির বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে—যা মোট আবেদনের প্রায় ৬৩ শতাংশ। তবে এখনো ৩৭ হাজারের বেশি আবেদনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ সম্পন্ন হয়নি।
তদন্ত প্রক্রিয়ার চিত্রে দেখা যায়, রেজিস্ট্রেশন অফিসারের কাছে ৩ হাজার ৫৩৬টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, ৫৪ হাজার ৪৭৭টির তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং বাতিল হয়েছে ২৬ হাজার ৫৯৫টি। এই তিন ক্যাটাগরিতে মোট আবেদনের সংখ্যা ৮৪ হাজার ৬০৮টি।
২০১৯ সালে মালয়েশিয়ায় বিদেশে এনআইডির যাত্রা শুরু
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে না ফিরেই ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি পাওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গতি পায় ২০১৯ সালে। এর আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির সময় থেকেই বিষয়টি আলোচনায় আসে এবং ২০১০ সালে ভোটার তালিকা আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়।
বাস্তবে এ কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের অনলাইনে ভোটার নিবন্ধন ও স্মার্ট এনআইডি দেওয়ার মাধ্যমে। এরপর একই বছরের ১৮ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই কার্যক্রম চালু হয়।
মালয়েশিয়া থেকে দুই হাজারের বেশি আবেদন
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর স্টেশনে ২ হাজার ৫০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৫১ জনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে। ৮২টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, ৮৯২টির তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং বাতিল হয়েছে ৬৬৪টি। সার্ভারে আপলোডের অপেক্ষায় রয়েছে ৩৫৭টি এবং আপলোড করা হয়েছে ৫৩৫টি। প্রিন্টের উপযোগী রয়েছে ২৩৫টি এবং ১৬৪টি স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট করে মিশন অফিসে পাঠানো হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে সর্বোচ্চ আবেদন
দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আবেদন এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। দেশটির আবুধাবি ও দুবাই স্টেশনে মোট ২৪ হাজার ৮২৫টি আবেদন জমা পড়েছে, যা মোট আবেদনের প্রায় ২৫ শতাংশ (এক-চতুর্থাংশ)।
এখানে ১৬ হাজার ৯৭৮ জনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে। ৬৮৮টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, ১৬ হাজার ৫৪৩টির তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং বাতিল হয়েছে ৬ হাজার ২০২টি। এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ১১১টি আবেদন আপলোড করা হয়েছে এবং আপলোডের অপেক্ষায় রয়েছে ৪৩২টি। আবুধাবি ও দুবাইয়ের জন্য ১২ হাজার ৩৪টি এনআইডি প্রিন্ট করে সংশ্লিষ্ট মিশনে পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবেদন, মুদ্রিত এনআইডি ৪,২৪৪টি
যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহাম স্টেশনে মোট ১৮ হাজার ৬২১টি আবেদন পাওয়া গেছে। দেশটিতে ১২ হাজার ১৪২ জনের বায়োমেট্রিক নেওয়া হয়েছে। ৩৩৫টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায়, ১০ হাজার ৭৪১টির তদন্ত সম্পন্ন এবং ৫ হাজার ৪০০টি বাতিল হয়েছে। আপলোডের অপেক্ষায় রয়েছে ৩ হাজার ১৩৫টি এবং আপলোড করা হয়েছে ৭ হাজার ৬০৬টি। বর্তমানে প্রিন্টের উপযোগী রয়েছে ১ হাজার ৪৭টি এবং ৪ হাজার ২৪৪টি এনআইডি প্রিন্ট করে মিশন অফিসে পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ হাজারের বেশি আবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মিশিগান, ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেশনে ১৮ হাজার ৪৭২টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৫৫৮ জনের বায়োমেট্রিক নেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ১৬৭টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায়, ১০ হাজার ৫৪টির তদন্ত সম্পন্ন এবং বাতিল হয়েছে ৩ হাজার ১৩১টি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেশন থেকে ৯ হাজার ৫৭২টি আবেদন আপলোড করা হয়েছে এবং ৪৮২টি অপেক্ষমাণ রয়েছে। প্রিন্টের উপযোগী রয়েছে ৪৯৫টি এবং ৫ হাজার ২৭৭টি এনআইডি প্রিন্ট করে পাঠানো হয়েছে।
ইতালিতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার আবেদন
ইতালির রোম ও মিলান স্টেশনে ৯ হাজার ৪৮০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩২৪ জনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে। ২৫৫টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায়, ৩ হাজার ৭৮২টির তদন্ত সম্পন্ন এবং বাতিল হয়েছে ৪ হাজার ১৪৬টি। দেশটিতে আপলোডের জন্য ৬২২টি আবেদন অপেক্ষমাণ এবং ৩ হাজার ১৬০টি আপলোড করা হয়েছে। সেখানে ২ হাজার ১৩৬টি এনআইডি প্রিন্ট করে মিশন অফিসে পাঠানো হয়েছে।
সৌদি আরবে প্রায় ৭ হাজার আবেদন
সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা স্টেশনে ৬ হাজার ৯৫৯টি আবেদন পাওয়া গেছে। বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে ৩ হাজার ২৪৪ জনের। ২৩৭টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায়, ২ হাজার ৯৭৩টির তদন্ত সম্পন্ন এবং বাতিল হয়েছে ২ হাজার ১০৬টি। মোট ২ হাজার ৭৬৮টি আবেদন আপলোড করা হয়েছে এবং ২ হাজার ১৮৯টি এনআইডি প্রিন্ট করে পাঠানো হয়েছে।
কুয়েত ও কাতারে কার্যক্রম
কুয়েত সিটি স্টেশনে ৫ হাজার ৯২১টি আবেদন পাওয়া গেছে এবং ৪ হাজার ৫৭৩ জনের বায়োমেট্রিক নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বাতিল হয়েছে ১ হাজার ৬৬৬টি। প্রিন্ট করা ২ হাজার ৩০টি এনআইডি মিশনে পাঠানো হয়েছে।
কাতারের দোহা স্টেশনে আবেদন পড়েছে ৪ হাজার ৮২৯টি। বায়োমেট্রিক নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৫৫৪ জনের। ১ হাজার ৬৭০টি আবেদন বাতিল হয়েছে এবং ৩৯৪টি এনআইডি প্রিন্ট করে পাঠানো হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার চিত্র
অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ও সিডনি স্টেশনে ১ হাজার ৪৫৯টি আবেদন জমা পড়েছে, বায়োমেট্রিক নেওয়া হয়েছে ৬০৬ জনের। ১২৩টি এনআইডি প্রিন্ট করে পাঠানো হয়েছে।
কানাডার অটোয়া ও টরন্টো স্টেশনে ৩ হাজার ৭৯৪টি আবেদন এসেছে, যার মধ্যে ২ হাজার ২৬০ জনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে ২১৬টি এনআইডি প্রিন্ট করে সংশ্লিষ্ট মিশন অফিসে পাঠানো হয়েছে।
জাপান, মালদ্বীপ, ওমান ও দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিস্থিতি
জাপানের টোকিও স্টেশনে ৩৬৫টি, মালদ্বীপের মালে স্টেশনে ৩২৮টি, ওমানের মাস্কাট স্টেশনে ২ হাজার ৫৭৩টি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া স্টেশনে ১৩৯টি আবেদন জমা পড়েছে। এই চার দেশে আবেদনকারীদের বায়োমেট্রিক ও আবেদন প্রক্রিয়াকরণ চলছে, তবে প্রতিবেদনটি তৈরির সময় পর্যন্ত কোনো এনআইডি প্রিন্ট হয়ে পৌঁছায়নি।
প্রিন্ট হয়েছে ২৮,৮০৭টি এনআইডি
সামগ্রিক হিসাবে প্রবাসে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমে এ পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৪৮৬টি আবেদন সার্ভারে আপলোড করা হয়েছে এবং আপলোডের জন্য ৫ হাজার ৯৮২টি অপেক্ষমাণ রয়েছে। প্রিন্ট করার উপযোগী রয়েছে ৩ হাজার ৭১৬টি আবেদন। এ পর্যন্ত মুদ্রিত ২৮ হাজার ৮০৭টি এনআইডিই সংশ্লিষ্ট মিশনগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিন দেশেই ৬২ শতাংশ আবেদন
পুরো কার্যক্রমের আবেদন সংখ্যার নিরিখে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে এগিয়ে। এই তিন দেশ থেকে মোট ৬১ হাজার ৯১৮টি আবেদন এসেছে—যা ১৪টি দেশের মোট আবেদনের প্রায় ৬২ শতাংশ।
অন্যদিকে জাপান, মালদ্বীপ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় আবেদনের হার বেশ কম; তিন দেশ মিলিয়ে মোট আবেদন মাত্র ৮৩২টি।
১৪ দেশ থেকে কার্যক্রম ১৯ দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালদ্বীপ, ওমান ও দক্ষিণ আফ্রিকার ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনে বর্তমানে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুর, বাহরাইন, সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডে সেবা বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা উদ্বোধন করা হয়েছে।
এক মিশন থেকে তিন দেশের সেবা
নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সুইডেনকে কেন্দ্র করে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের প্রবাসীদের এনআইডি সেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডে বসবাসরত প্রবাসীরা সুইডেন মিশনে গিয়ে এই সেবা নিতে পারবেন। প্রশিক্ষণসংক্রান্ত প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থাকায় ফ্রান্সে আপাতত কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।
সামনে আরও বিস্তারের ইঙ্গিত
প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা ও এনআইডি সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে আরও নতুন দেশে এনআইডি কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। প্রবাসী ভোটারদের জন্য ইতিমধ্যেই আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 



















