প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আঁচ এসে লাগছে বাংলাদেশের মানুষের ঘরে। জ্বালানির দাম বাড়ছে, গ্যাসের সংকটে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সার উৎপাদন কমছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন থেকে কৃষি, খাবারের দাম থেকে মানুষের আয়-রোজগারে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, এই সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল যাদের, তাদের সংখ্যাও অনেক কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এই সংকটে পড়েছে এমন এক সময়ে, যখন অর্থনীতি এমনিতেই বেশ চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি বেশি, ব্যাংক খাত দুর্বল এবং সরকারের হাতে খরচ করার মতো অর্থও কমে এসেছে।
গত কয়েক বছরে দেশে দারিদ্র্যও বেড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান খুব বেশি তৈরি হয়নি। মানুষের আয়ও সেভাবে বাড়েনি। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি যোগ হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছ না।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৩ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। ২০২৪ সালের পরিস্থিতিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু না হলে এ বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়াতে পারে মাত্র ৫ লাখে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হারাতে পারেন আরও অনেক মানুষ।যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দামে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ৯০ শতাংশ। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু তেল বা গ্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন খরচ বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়বে, কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত খাবারসহ নানা পণ্যের দামও বাড়তে পারে। জ্বালানির বাড়তি দাম যদি ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি ০.৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
এর পরের ধাপে খাবার ও অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে। আর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে দরিদ্র মানুষের ওপর। ফলে ধনী-গরিবের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
তবে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলেও তিনি মনে করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, দেশে সার উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম, সবই এর কারণে চাপে পড়ছে।
বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো, জ্বালানির জন্য আমরা অনেকটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি।
দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহে কোনো বড় সমস্যা হলেই বাংলাদেশ সরাসরি ধাক্কা খায়।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানি পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ডেস্ক রিপোর্টঃ 



















