ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে কটুক্তির দাবি, অব্যাহতিপ্রাপ্ত এনসিপি নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর গ্রেপ্তার বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী পরিষদের অভিষেক ও ‘অগ্রযাত্রা-২০২৬’ অনুষ্ঠিত নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাগেরহাটে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উদযাপিত টেকনাফ হোয়াইক্যংয়ে বিজিবির পৃথক অভিযানে ৪৮ হাজার ইয়াবা উদ্ধার, আটক ১ জলঢাকায় জমির আবর্জনা সরানো নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৪, থানায় অভিযোগ মনপুরায় ভাঙনরোধে হাজার কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ হলেও কাটেনি চরাঞ্চলবাসীর আতঙ্ক মোরেলগঞ্জে নানা আয়োজনে পালিত হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পিরোজপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত নলছিটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা পিরোজপুরে ইবতেদায়ী মাদ্রাসার সভাপতির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন: ক্ষতিগ্রস্তরা নিরাপত্তাহীনতায়

মনপুরায় ভাঙনরোধে হাজার কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ হলেও কাটেনি চরাঞ্চলবাসীর আতঙ্ক

 

ভোলা জেলার পানিবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন উপজেলা মনপুরায় নদীভাঙন রোধে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বাঁধ নির্মাণ করলেও অবহেলিত মনপুরার চরাঞ্চলবাসীর আতঙ্ক এখনো কাটেনি। মেঘনা নদীর উত্তাল ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস ও ভয়াবহ নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছেন এই উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষ। সেই দুর্ভোগ লাঘবে সরকার প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পটি ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হলেও বাস্তব চিত্র নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘ভোলা জেলার মুজিবনগর-মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প’-এর আওতায় কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কাজের এক-তৃতীয়াংশও শেষ হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদাররা বিভিন্ন সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ করানোর ফলে নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

 

​সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে বড় গর্ত, ধসে যাওয়া স্থান এবং বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত মান অনুযায়ী বালু ব্যবহার না করে কোথাও কোথাও মাটি কিংবা বালুমিশ্রিত মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এছাড়া সংরক্ষিত চরাঞ্চল থেকে মাটি সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। এতে একদিকে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টির পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁধের দুর্বল অংশ দিয়ে বালু ও পানি ঢুকে শত শত একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের একমাত্র ভরসা ধানের ক্ষেত বালুচাপায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

 

​স্থানীয় চরাঞ্চলবাসীর অভিযোগ, একাধিক ধাপে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দেওয়ায় নির্মাণের মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি বাঁধের এমন অবস্থা হয়, তবে বড় জলোচ্ছ্বাস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরো প্রকল্পই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প ঘিরে অতীতেও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের দাবি, অনিয়মের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল নেতা রাশেদের নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।

 

​চরাঞ্চলের বাসিন্দারা আরও জানান, গত বছর নির্মাণাধীন বাঁধের একটি গভীর গর্তে পড়ে বালুচাপায় ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। তাঁদের অভিযোগ, নির্মাণস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনাটি এড়ানো সম্ভব ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

চরাঞ্চলের স্থানীয়দের ভাষায়, আকাশে কালো মেঘ জমলেই উদ্বেগ বেড়ে যায়। কারণ এই বেড়িবাঁধই তাদের শেষ ভরসা। বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই প্লাবিত হতে পারে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার উৎস।

 

​এ বিষয়ে ভোলা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২ (চরফ্যাশন)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদ্দৌলা বলেন, “বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত এক্সকাভেটর দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারকাজ শুরু হবে।” তিনি আরও বলেন, “নির্মাণকাজের কারণে যেসব ফসলি জমিতে বালু জমে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে, সেসব জমি থেকে বালু অপসারণ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।”

চরাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তার জন্য বাস্তবায়নাধীন এই বৃহৎ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, কাজের মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে মনপুরার মানুষ। দেড় লক্ষাধিক চরাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা—শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেই নির্মিত হোক একটি টেকসই, মানসম্মত ও নিরাপদ বেড়িবাঁধ, যা ভবিষ্যতে মেঘনার ভয়াল থাবা থেকে তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষা করবে।

জনপ্রিয়

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে কটুক্তির দাবি, অব্যাহতিপ্রাপ্ত এনসিপি নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর গ্রেপ্তার

মনপুরায় ভাঙনরোধে হাজার কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ হলেও কাটেনি চরাঞ্চলবাসীর আতঙ্ক

আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে

 

ভোলা জেলার পানিবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন উপজেলা মনপুরায় নদীভাঙন রোধে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বাঁধ নির্মাণ করলেও অবহেলিত মনপুরার চরাঞ্চলবাসীর আতঙ্ক এখনো কাটেনি। মেঘনা নদীর উত্তাল ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস ও ভয়াবহ নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছেন এই উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষ। সেই দুর্ভোগ লাঘবে সরকার প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পটি ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হলেও বাস্তব চিত্র নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘ভোলা জেলার মুজিবনগর-মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প’-এর আওতায় কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কাজের এক-তৃতীয়াংশও শেষ হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদাররা বিভিন্ন সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ করানোর ফলে নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

 

​সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে বড় গর্ত, ধসে যাওয়া স্থান এবং বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত মান অনুযায়ী বালু ব্যবহার না করে কোথাও কোথাও মাটি কিংবা বালুমিশ্রিত মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এছাড়া সংরক্ষিত চরাঞ্চল থেকে মাটি সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। এতে একদিকে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টির পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁধের দুর্বল অংশ দিয়ে বালু ও পানি ঢুকে শত শত একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের একমাত্র ভরসা ধানের ক্ষেত বালুচাপায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

 

​স্থানীয় চরাঞ্চলবাসীর অভিযোগ, একাধিক ধাপে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ দেওয়ায় নির্মাণের মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি বাঁধের এমন অবস্থা হয়, তবে বড় জলোচ্ছ্বাস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরো প্রকল্পই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প ঘিরে অতীতেও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের দাবি, অনিয়মের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল নেতা রাশেদের নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।

 

​চরাঞ্চলের বাসিন্দারা আরও জানান, গত বছর নির্মাণাধীন বাঁধের একটি গভীর গর্তে পড়ে বালুচাপায় ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। তাঁদের অভিযোগ, নির্মাণস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনাটি এড়ানো সম্ভব ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

চরাঞ্চলের স্থানীয়দের ভাষায়, আকাশে কালো মেঘ জমলেই উদ্বেগ বেড়ে যায়। কারণ এই বেড়িবাঁধই তাদের শেষ ভরসা। বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই প্লাবিত হতে পারে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার উৎস।

 

​এ বিষয়ে ভোলা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২ (চরফ্যাশন)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদ্দৌলা বলেন, “বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত এক্সকাভেটর দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারকাজ শুরু হবে।” তিনি আরও বলেন, “নির্মাণকাজের কারণে যেসব ফসলি জমিতে বালু জমে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে, সেসব জমি থেকে বালু অপসারণ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।”

চরাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তার জন্য বাস্তবায়নাধীন এই বৃহৎ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, কাজের মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে মনপুরার মানুষ। দেড় লক্ষাধিক চরাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা—শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেই নির্মিত হোক একটি টেকসই, মানসম্মত ও নিরাপদ বেড়িবাঁধ, যা ভবিষ্যতে মেঘনার ভয়াল থাবা থেকে তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষা করবে।