বৃষ্টির ঘাটতি ও চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের প্রায় চার লক্ষাধিক হেক্টর কৃষিজমিতে বোরোধানের আবাদ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে মাঠে থাকা প্রায় ১৫ লাখ টন তরমুজ নিয়েও চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
চলতি রবি মৌসুমে প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্তের এই অঞ্চলে ১৮ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষকরা মাঠে পরিচর্যায় ব্যস্ত। তবে ধানের থোর ও ফুল পর্যায় এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টির অভাব ও ডিজেলের অনিশ্চয়তায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। অনাবৃস্টির ফলে সেচের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, আর এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
বর্তমানে বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ৮৭ হাজার পাওয়ার পাম্পের মধ্যে ৭৪ হাজারই ডিজেলচালিত। এসব পাম্প চালাতে প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে গড়ে ৫ লাখ লিটার ডিজেল; কিন্তু অনেক এলাকায় চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় কৃষকদের ভোগান্তি বাড়ছে। এমনকি পল্লী অঞ্চলে ডিজেল লিটারপ্রতি ১০-১২ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসন মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং করছে।
এদিকে বরিশালে এবার প্রায় ৭১ হাজার হেক্টর জমিতে রেকর্ড পরিমাণ তরমুজ আবাদ হয়েছে, যার উৎপাদন প্রায় ৩৫ লাখ টন। ইতোমধ্যে অর্ধেক বাজারজাত হলেও এখনও প্রায় ১৫ লাখ টন তরমুজ মাঠে রয়েছে। তবে এই সময়ে অতিবৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদরা। গত বছর কালবৈশাখীর আঘাতে প্রায় ১০ হাজার হেক্টরের তরমুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে বৃষ্টির অভাবে বোরো ধানে সেচব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি তরমুজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে অর্থাৎ দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে কৃষি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৫ মে পর্যন্ত বোরো জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ সময় স্বাভাবিক বৃষ্টি হলে তা ধানের জন্য আশীর্বাদ হবে এবং সেচব্যয়ও কমবে। দীর্ঘমেয়াদে সেচব্যবস্থাকে ডিজেলনির্ভরতা থেকে বের করে সোলার ও বিদ্যুতায়নের ওপর জোর দিয়েছেন কৃষিবিদরা। বর্তমানে বরিশালে মাত্র ৪০টি সোলার সেচযন্ত্র দিয়ে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী এপ্রিল মাসে ১২০-১৪০ মিলিমিটার এবং মে মাসে ২৩০-২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় এবং কালবৈশাখীর আশঙ্কাও রয়েছে। সব মিলিয়ে, আগামী দেড় মাস বরিশালের কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, যেখানে বৃষ্টির সঠিক ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে কৃষকের হাসি না হতাশা।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. মাহফুজুর রহমান নিয়মিতভাবে সব জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে মাঠ পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়টি মনিটরিং করছেন। তিনি সব জেলা প্রশাসককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণসহ সার্বক্ষণিকভাবে নজরদারিরও তাগিদ দিয়েছেন। চলতি রবি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে ৩ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টরে আবাদের মাধ্যমে প্রায় ১৮ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তোলার লক্ষ্য স্থির রয়েছে। গত ১৫ মার্চ বরিশাল কৃষি অঞ্চলে বোরো রোপণের শেষ দিন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ অর্জিত হলেও ডিজেল নিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে নির্বিঘ্ন সেচব্যবস্থার অভাবে কৃষকের মনে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।

সাব্বির আলম বাবুঃ 


















