ঢাকা , সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
এশিয়া পোস্টের সম্পাদককে হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের আইনি নোটিশ মাসুদ সাঈদীর উপকূলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ চায় ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম বাগেরহাট মায়ানমারে পাচারকালে সেন্টমার্টিনে বিপুল সিমেন্ট জব্দ, আটক ৯ আর কত রামিসাকে হারাতে হবে? রামিসা হত্যা মামলার চার্জশিট আজই, ৫-৭ দিনের মধ্যে বিচার – স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জমকালো আয়োজনে গুরুর বাড়ি কিডস কমিউনিটির বৈশাখী কিডস ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত মোরেলগঞ্জের চিংড়াখালী ইউনিয়নে মৎস্য ভিজিএফ (VGF) চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে আ.লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সিনিয়র আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন মারা গেছেন টানা ৮ ঘণ্টার বেশি গণপরিবহন চালালেই লাইসেন্স বাতিল ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে প্রস্তুত ২৫১ রেলকোচ

২২ দিন পর পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরা শুরু

 

নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে ইলিশের নির্বিঘ্নে প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে টানা ২২ দিনের আহরন, পরিবহন ও বিপননে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে রোববার মধ্যরাতে।

 

এর ফলে বরিশাল উপকূল এলাকার জেলে পল্লীসহ মৎস্য আড়ৎগুলো আবার কর্ম চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মধ্যরাত থেকেই জেলেরা নাও ভাসাবে বরিশাল উপকূলসহ অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে। ইতোমধ্যে নৌকা, ট্রলার ও জালসহ সব মৎস্য আহরন উপকরনও প্রস্তুত করেছেন জেলেরা। আড়ৎদার ও মহানজনরা ইতোমধ্যে দাদন (আগাম মাছের দাম) দিয়ে জেলেদের সাগর ও নদীতে পাঠানোর কাজটিও চুড়ান্ত করেছে। বরিশালের পোর্ট রোডের মৎস্য আড়ৎগুলোর নিরবতাও ভঙ্গ হয়েছে ইতোমধ্যে। পাশাপাশি আলীপুর-মহীপুর, হরিনঘাটা, পাড়েরহাট, চর মোন্তাজ, ঢালচর, চর কুকরী-মুকরীসহ উপকূলের সব মৎস্য আড়ৎগুলোও ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে।

 

দেশে আহরিত প্রায় ৫.৮০ লাখ টন ইলিশের ৭০ ভাগই বরিশাল অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ও উপকুলীয় এলাকায় উৎপাদন ও আহরন হচ্ছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে বিগত বছরগুলোর মত এবারো বাংলাদেশের উপকূলসহ সমুদ্র সীমায় ভারতীয় অনেক জেলে নৌকা ও ট্রলার অবৈধভাবে প্রবেশ করে মাছ লুটে নিয়েছে। এবারো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে অন্তত ১০টি ভারতীয় ট্রলার আটকের পরে পুলিশের কাছে সোপার্দ করে বিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

গত কয়েক বছর ধরে নিরাপদ প্রজনেন ২২দিন এবং সাগরে মৎস্য আহরনে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে ভারতীয় শত শত ট্রলার অবৈধভাবে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় প্রবেশ করে মাছ লুটে নেয়ার ঘটনায়ও একাধিক ট্রলার আটক হয়েছে। পরবর্তিতে অবশ্য ভারত সরকারের অনুরোধে ওইসব লুটেরাদের বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সসম্মানে হস্তান্তর করা হয়। ইলিশের নিবারপদ প্রজনন নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে করতে দেশের উপকূলের ৭ হাজার ৩৩৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছসহ সারা দেশে ইলিশ আহরন, পরিবহন ও বিপননে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয় গত ১৩ অক্টোবর মধ্যরাতে।

 

এবারো এ নিষেধাজ্ঞা কালীন সময়ে দেশের দক্ষিণ উপকূলের ৩৭টি জেলার ১৫৫টি উপজেলার ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬৫ জেলেকে মানবিক খাদ্য সহায়তা হিসেবে পরিবারপিছু ২৫ কেজি করে ১৪ হাজার ১৬৫ টন চাল বিতরন করা হয়েছে।

 

তবে এবছর বরিশাল সহ দক্ষিণ উপকুলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মৎস্য আহরন প্রবনতা অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশী লক্ষ্য করা গেছে। যদিও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা ছাড়াও ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে জেল-জরিমানাসহ নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। এলক্ষ্যে পুলিশ ও র‌্যাব ছাড়াও কোস্ট গার্ড এবং নৌ বাহিনীও মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছে। এমনকি এলক্ষে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

 

মৎস্য অধিধপ্তরের মতে, গত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়ে বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১০ হাজার অভিযান ছাড়াও ২ সহশ্রাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ২ হাজার জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৭০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এসময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রায় ৬ কোটি মিটার জাল বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে ফেলাসহ বিভিন্ন মৎস্য উপকরন বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রী করে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। অভিযানকালে প্রায় ৫৫ টন ইলিশ আটক করে বিভিন্ন এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং-এ দান করা হয়েছে। এসময় আইন ভঙ্গের অভিযোগ আরও প্রায় ৩ হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে জেলেসহ মৎস্যজীবীদের বিরুদ্ধে। নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীগন পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তায় প্রায় ৫০ হাজার মৎস্য আড়ৎ, বাজার, মাছঘাট পরিদর্শন করে ইলিশ বিপনন নিয়ন্ত্রনে কাজ করেছে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, সারা বিশ্বের ৬০% এরও বেশী ইলিশ এখন বাংলাদেশেই উৎপাদন হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতিতে জাতীয় মাছ ইলিশের একক অবদান এখন ১% এর বেশী। আর মৎস্য খাতে অবদান প্রায় ১২.৫০%।

 

আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে পরের ২২ দিন এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের প্রজনন সময় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে এসময় কিছুটা হেরফের করা হচ্ছে।

 

‘হিলসা ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্লান’ এর আওতায় ২০০৫ সালেই প্রথম প্রধান প্রজনন মৌসুমে ১০ দিন ইলিশের আহরণ বন্ধ রাখা হয়। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে ২০১১ সালে তা ১১ দিন এবং ২০১৫ সালে ১৫ দিন ও ২০১৬ সালে থেকে ২২ দিনে উন্নীত করা হয়েছে। এমনকি ইলিশ নিয়ে নানামুখি গবেষনা ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহনের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন এক সময়ে ১.৯৮ লাখ টন থেকে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ৫.৬৫ লাখ টনে উন্নীত হবার পরে সদ্য সমাপ্ত অর্থ বছরে তা ৫.৮০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর আশাবাদী।

 

ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র ও মাইগ্রেশন পথ নির্বিঘে রাখাসহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুত ও জীব বৈচিত্রকে সমৃদ্ধ করতে ইতোমধ্যে নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বা মেরিন রিজার্ভ এরিয়া ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি গত ২২দিনে মা ইলিশ যে ডিম ছেড়েছে তা থেকে লার্ভা হয়ে ইলিশ পোনা সংরক্ষণে গত ১ নভেম্বর থেকে ৮ মাসের জন্য জাটকা আহরন, পরিবহন ও বিপননে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। এসময়ে বরিশাল উপকূলের ৬টি এলাকাকে দু মাস করে ‘অভায়শ্রম’ ঘোষনা করে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। প্রতিদিন শ্রোতের বিপরিতে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলা অভিপ্রয়াণী মাছ ইলিশ জীবনচক্রে স্বাদুপানি থেকে সমুদ্রের নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়াণ করে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, উপকূলের ৭ হাজার ৩৩৪ বর্গ কিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মূক্ত ভাসমান অবস্থায় ছাড়া ডিম থেকে ফুটে বের হয়ে ইলিশের লার্ভা, স্বাদুপানি ও নোনা পানির নার্সারী ক্ষেত্রসমুহে বিচরণ করে খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে। অভয়াশ্রমের ‘নার্সারী ক্ষেত্র’ সমুহে ৭ থেকে ১০ সপ্তাহ ভেসে বেড়াবার পরে জাটকা হিসেব সমুদ্রে গিয়ে পরিপক্কতা অর্জন করে। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় ১২ থেকে ১৮ মাস অবস্থানের পরে পরিপক্ক হয়েই পূর্ণাঙ্গ ইলিশ হিসেবে প্রজননের লক্ষ্যে আবার স্বাদু পানির নার্সারী ক্ষেত্রে ফিরে এসে ডিম ছাড়ে।

 

মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের ইকোসিষ্টেমে সারা বছরই ৩০% ইলিশ ডিম বহন করে। এসব ইলিশ পরিপক্ক হয়ে ডিম ছাড়ে। যে ডিমগুলো পুরুষ ইলিশ দ্বারা নিষিক্ত হয়ে থাকে, তা নতুন প্রজন্ম গঠন করে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের গবেষনায় দেখা গেছে, নজরদারী বৃদ্ধির ফলে দেশে ইলিশপোনা-জাটকা’র উৎপাদন ২০১৫ সালে ৩৯ হাজার ২৬৮ কোটি থেকে ২০১৭ সালে ৪২,২৭৪ কোটিতে উন্নীত হয়। এমনকি ২০২২ সালের প্রজনন মৌসুমে দক্ষিণ উপকূলসহ সংলগ্ন অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে প্রায় ৮৪% মা ইলিশ ডিম ছাড়ে। এরমধ্যে ৫২ ভাগ মা ইলিশ ২২ দিনের মূল প্রজননকালীন সময়ে এবং আরো ৩২% ডিম ছাড়ারত ছিল। যা ছিল অগের বছরের প্রজননকালের চেয়ে প্রায় ২.৪৫% বেশী। ফলে ওই বছর ৪৩ হাজার কোটিরও বেশী জাটকা ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছে বলে মৎস্য গবেষনা ইনস্টিটিউট এর দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। ২০১৮ এর আহরন নিষিদ্ধকালে উপকূলের প্রজননস্থলসহ অভ্যন্তরীন মূক্ত জলাশয়ে ৪৮% মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলেও ২০১৭ সালে তা ৭৩% এবং ২০১৮ সালে ৯৩% এ উন্নীত হয়। পাশাপাশি এসময়ে প্রজনন সাফল্য ৮০% উন্নীত হয়।

জনপ্রিয়

এশিয়া পোস্টের সম্পাদককে হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের আইনি নোটিশ মাসুদ সাঈদীর

২২ দিন পর পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরা শুরু

আপডেট : ০৩:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ নভেম্বর ২০২৪

 

নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে ইলিশের নির্বিঘ্নে প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে টানা ২২ দিনের আহরন, পরিবহন ও বিপননে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে রোববার মধ্যরাতে।

 

এর ফলে বরিশাল উপকূল এলাকার জেলে পল্লীসহ মৎস্য আড়ৎগুলো আবার কর্ম চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মধ্যরাত থেকেই জেলেরা নাও ভাসাবে বরিশাল উপকূলসহ অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে। ইতোমধ্যে নৌকা, ট্রলার ও জালসহ সব মৎস্য আহরন উপকরনও প্রস্তুত করেছেন জেলেরা। আড়ৎদার ও মহানজনরা ইতোমধ্যে দাদন (আগাম মাছের দাম) দিয়ে জেলেদের সাগর ও নদীতে পাঠানোর কাজটিও চুড়ান্ত করেছে। বরিশালের পোর্ট রোডের মৎস্য আড়ৎগুলোর নিরবতাও ভঙ্গ হয়েছে ইতোমধ্যে। পাশাপাশি আলীপুর-মহীপুর, হরিনঘাটা, পাড়েরহাট, চর মোন্তাজ, ঢালচর, চর কুকরী-মুকরীসহ উপকূলের সব মৎস্য আড়ৎগুলোও ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে।

 

দেশে আহরিত প্রায় ৫.৮০ লাখ টন ইলিশের ৭০ ভাগই বরিশাল অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ও উপকুলীয় এলাকায় উৎপাদন ও আহরন হচ্ছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে বিগত বছরগুলোর মত এবারো বাংলাদেশের উপকূলসহ সমুদ্র সীমায় ভারতীয় অনেক জেলে নৌকা ও ট্রলার অবৈধভাবে প্রবেশ করে মাছ লুটে নিয়েছে। এবারো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে অন্তত ১০টি ভারতীয় ট্রলার আটকের পরে পুলিশের কাছে সোপার্দ করে বিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

গত কয়েক বছর ধরে নিরাপদ প্রজনেন ২২দিন এবং সাগরে মৎস্য আহরনে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে ভারতীয় শত শত ট্রলার অবৈধভাবে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় প্রবেশ করে মাছ লুটে নেয়ার ঘটনায়ও একাধিক ট্রলার আটক হয়েছে। পরবর্তিতে অবশ্য ভারত সরকারের অনুরোধে ওইসব লুটেরাদের বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সসম্মানে হস্তান্তর করা হয়। ইলিশের নিবারপদ প্রজনন নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে করতে দেশের উপকূলের ৭ হাজার ৩৩৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছসহ সারা দেশে ইলিশ আহরন, পরিবহন ও বিপননে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয় গত ১৩ অক্টোবর মধ্যরাতে।

 

এবারো এ নিষেধাজ্ঞা কালীন সময়ে দেশের দক্ষিণ উপকূলের ৩৭টি জেলার ১৫৫টি উপজেলার ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬৫ জেলেকে মানবিক খাদ্য সহায়তা হিসেবে পরিবারপিছু ২৫ কেজি করে ১৪ হাজার ১৬৫ টন চাল বিতরন করা হয়েছে।

 

তবে এবছর বরিশাল সহ দক্ষিণ উপকুলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মৎস্য আহরন প্রবনতা অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশী লক্ষ্য করা গেছে। যদিও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা ছাড়াও ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে জেল-জরিমানাসহ নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। এলক্ষ্যে পুলিশ ও র‌্যাব ছাড়াও কোস্ট গার্ড এবং নৌ বাহিনীও মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছে। এমনকি এলক্ষে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

 

মৎস্য অধিধপ্তরের মতে, গত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়ে বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১০ হাজার অভিযান ছাড়াও ২ সহশ্রাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ২ হাজার জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৭০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এসময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রায় ৬ কোটি মিটার জাল বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে ফেলাসহ বিভিন্ন মৎস্য উপকরন বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রী করে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। অভিযানকালে প্রায় ৫৫ টন ইলিশ আটক করে বিভিন্ন এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং-এ দান করা হয়েছে। এসময় আইন ভঙ্গের অভিযোগ আরও প্রায় ৩ হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে জেলেসহ মৎস্যজীবীদের বিরুদ্ধে। নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীগন পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তায় প্রায় ৫০ হাজার মৎস্য আড়ৎ, বাজার, মাছঘাট পরিদর্শন করে ইলিশ বিপনন নিয়ন্ত্রনে কাজ করেছে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, সারা বিশ্বের ৬০% এরও বেশী ইলিশ এখন বাংলাদেশেই উৎপাদন হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতিতে জাতীয় মাছ ইলিশের একক অবদান এখন ১% এর বেশী। আর মৎস্য খাতে অবদান প্রায় ১২.৫০%।

 

আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে পরের ২২ দিন এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের প্রজনন সময় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে এসময় কিছুটা হেরফের করা হচ্ছে।

 

‘হিলসা ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্লান’ এর আওতায় ২০০৫ সালেই প্রথম প্রধান প্রজনন মৌসুমে ১০ দিন ইলিশের আহরণ বন্ধ রাখা হয়। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে ২০১১ সালে তা ১১ দিন এবং ২০১৫ সালে ১৫ দিন ও ২০১৬ সালে থেকে ২২ দিনে উন্নীত করা হয়েছে। এমনকি ইলিশ নিয়ে নানামুখি গবেষনা ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহনের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন এক সময়ে ১.৯৮ লাখ টন থেকে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ৫.৬৫ লাখ টনে উন্নীত হবার পরে সদ্য সমাপ্ত অর্থ বছরে তা ৫.৮০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর আশাবাদী।

 

ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র ও মাইগ্রেশন পথ নির্বিঘে রাখাসহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুত ও জীব বৈচিত্রকে সমৃদ্ধ করতে ইতোমধ্যে নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বা মেরিন রিজার্ভ এরিয়া ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি গত ২২দিনে মা ইলিশ যে ডিম ছেড়েছে তা থেকে লার্ভা হয়ে ইলিশ পোনা সংরক্ষণে গত ১ নভেম্বর থেকে ৮ মাসের জন্য জাটকা আহরন, পরিবহন ও বিপননে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। এসময়ে বরিশাল উপকূলের ৬টি এলাকাকে দু মাস করে ‘অভায়শ্রম’ ঘোষনা করে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। প্রতিদিন শ্রোতের বিপরিতে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলা অভিপ্রয়াণী মাছ ইলিশ জীবনচক্রে স্বাদুপানি থেকে সমুদ্রের নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়াণ করে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, উপকূলের ৭ হাজার ৩৩৪ বর্গ কিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মূক্ত ভাসমান অবস্থায় ছাড়া ডিম থেকে ফুটে বের হয়ে ইলিশের লার্ভা, স্বাদুপানি ও নোনা পানির নার্সারী ক্ষেত্রসমুহে বিচরণ করে খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে। অভয়াশ্রমের ‘নার্সারী ক্ষেত্র’ সমুহে ৭ থেকে ১০ সপ্তাহ ভেসে বেড়াবার পরে জাটকা হিসেব সমুদ্রে গিয়ে পরিপক্কতা অর্জন করে। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় ১২ থেকে ১৮ মাস অবস্থানের পরে পরিপক্ক হয়েই পূর্ণাঙ্গ ইলিশ হিসেবে প্রজননের লক্ষ্যে আবার স্বাদু পানির নার্সারী ক্ষেত্রে ফিরে এসে ডিম ছাড়ে।

 

মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের ইকোসিষ্টেমে সারা বছরই ৩০% ইলিশ ডিম বহন করে। এসব ইলিশ পরিপক্ক হয়ে ডিম ছাড়ে। যে ডিমগুলো পুরুষ ইলিশ দ্বারা নিষিক্ত হয়ে থাকে, তা নতুন প্রজন্ম গঠন করে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের গবেষনায় দেখা গেছে, নজরদারী বৃদ্ধির ফলে দেশে ইলিশপোনা-জাটকা’র উৎপাদন ২০১৫ সালে ৩৯ হাজার ২৬৮ কোটি থেকে ২০১৭ সালে ৪২,২৭৪ কোটিতে উন্নীত হয়। এমনকি ২০২২ সালের প্রজনন মৌসুমে দক্ষিণ উপকূলসহ সংলগ্ন অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে প্রায় ৮৪% মা ইলিশ ডিম ছাড়ে। এরমধ্যে ৫২ ভাগ মা ইলিশ ২২ দিনের মূল প্রজননকালীন সময়ে এবং আরো ৩২% ডিম ছাড়ারত ছিল। যা ছিল অগের বছরের প্রজননকালের চেয়ে প্রায় ২.৪৫% বেশী। ফলে ওই বছর ৪৩ হাজার কোটিরও বেশী জাটকা ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছে বলে মৎস্য গবেষনা ইনস্টিটিউট এর দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। ২০১৮ এর আহরন নিষিদ্ধকালে উপকূলের প্রজননস্থলসহ অভ্যন্তরীন মূক্ত জলাশয়ে ৪৮% মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলেও ২০১৭ সালে তা ৭৩% এবং ২০১৮ সালে ৯৩% এ উন্নীত হয়। পাশাপাশি এসময়ে প্রজনন সাফল্য ৮০% উন্নীত হয়।