ঢাকা , শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
বাগেরহাটে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য মিছিল নীলফামারী জলঢাকায় ৫ বছরে ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন ঝালকাঠিতে ধর্ষণ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ: ফেসবুক লাইভে এসে গলায় ফাঁস দিয়ে যুবকের আত্মহত্যা উখিয়া থেকে অপহৃত তরুণকে টেকনাফে উদ্ধার আধুনিক বরুড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতীয় অর্থনীতির পথিকৃৎ, মরহুম এ কে এম আবু তাহেরের অমর স্মৃতিতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি পুরনো ছবি দেখে অঝোরে কাঁদলেন মাওলানা ইউসুফ নিজামী “তারা আজ কেউ নেই” সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বরিশালে মহাসড়ক অবরোধ খানজাহান আলী মাজারের কুমিরের আক্রমণে নিহত, ফাতেমার মা পরিবারে ফিরল তিন বছর পর কেন্দ্রীয় যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বানারীপাড়ার সন্তান মাহবুব শিকদার

আধুনিক বরুড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতীয় অর্থনীতির পথিকৃৎ, মরহুম এ কে এম আবু তাহেরের অমর স্মৃতিতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

 

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন শুধু নিজের জন্য নয়, অনেকের জীবন আলোকিত করতে। কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতি, ভালোবাসা আর কীর্তি এতটাই গভীরে প্রোথিত থাকে যে মৃত্যুও তাঁদের মুছে দিতে পারে না। বরুড়ার সেই চিরচেনা রাস্তায় আজও যেন তাঁর পায়ের ছাপ খোঁজা যায়। সেই মেঠোপথ, সেই বিদ্যালয়ের আঙিনা, সেই মসজিদের মিনার, সেই দরিদ্র মানুষের কুঁড়েঘর, সবখানে যেন এখনও তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

 

তিনি মরহুম এ কে এম আবু তাহের। বরুড়ার গর্ব, কুমিল্লার অহংকার, বাংলাদেশের এক অবিস্মরণীয় সন্তান।

 

একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে ইতিহাসের পাতায়

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের সোনাইমুড়ী গ্রাম। সবুজে ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামটির হাজী ইমাম উদ্দিন পরিবারে আনুমানিক ১৯৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন এক অনন্য মানুষ। সেদিন কেউ জানত না, এই শিশুটি একদিন বরুড়ার মানচিত্র পাল্টে দেবেন। দেশের ব্যাংকিং খাতে আনবেন যুগান্তকারী পরিবর্তন। হাজার হাজার বেকার মানুষের মুখে ফোটাবেন জীবিকার হাসি। আর বরুড়ার প্রতিটি অলিগলিতে ছড়িয়ে দেবেন উন্নয়নের আলো।

 

সেই শিশুটিই বড় হয়ে হলেন এ কে এম আবু তাহের। একাধারে শিল্পপতি, সংসদ সদস্য, সমাজসেবক এবং অগণিত মানুষের পরম আপনজন।

 

মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সারা দেশ তখন রক্ত আর আগুনের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। সেই দুঃসময়ে এ কে এম আবু তাহের দেশমাতৃকার পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিলেন। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেন। কারাগারে সহ্য করলেন অমানবিক নির্যাতন। তবু মাথা নত করেননি একটুও। দেশকে ভালোবেসেছিলেন প্রাণের চেয়েও বেশি। এই দেশপ্রেমই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

 

গণমানুষের কণ্ঠস্বর, তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য

রাজনীতিতে তিনি এসেছিলেন মানুষের ডাকে সাড়া দিতে, ক্ষমতার মসনদে বসতে নয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মনোনয়নে কুমিল্লা-৭ বরুড়া আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। প্রতিটি নির্বাচনে বরুড়ার মানুষ তাঁকে বুকে আঁকড়ে ধরেছে। কারণ তিনি শুধু ভোটের সময় আসতেন না। বন্যায়, দুর্ভিক্ষে, বিপদে-আপদে সবসময় পাশে থাকতেন।

 

তাঁর সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়েই বরুড়াকে পৌরসভায় রূপান্তরিত করা হয়, যা ছিল এই অঞ্চলের উন্নয়নের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ নির্মাণ করে তিনি বরুড়ার গ্রামীণ জনপদকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন। বরুড়ার আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছিল একের পর এক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ আর এতিমখানা। অহংকারহীন, সহজ-সরল এই মানুষটির দরজা সবসময় খোলা থাকত সাধারণ মানুষের জন্য। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কাছে তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত অভিভাবক।

 

দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব, ন্যাশনাল ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টা

এ কে এম আবু তাহের শুধু বরুড়ার নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সারা বাংলাদেশের একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, স্পন্সর ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যান। এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, তা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 

এর পাশাপাশি তিনি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওরিয়ন লিমিটেড, বেকো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, জিতা গার্মেন্টস লিমিটেড, পূর্বাচল ড্রিলার্স লিমিটেড, ইউনিভার্সাল মেশিনারি প্রাইভেট লিমিটেড, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স এবং মোহাম্মদ বশির এন্ড কোং-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য অঙ্গনে তিনি রেখে গেছেন অমোচনীয় ছাপ।

 

শিল্পপতি হিসেবে তিনি হাজার হাজার বেকার তরুণের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কর্মসংস্থানের সুযোগ। বরুড়ার অনেক পরিবার আজও তাঁর দেওয়া জীবিকার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে চোখের জল মোছে।

 

হাতে গড়া মেডিকেল সেন্টার, একটি অপূর্ণ স্বপ্নের আবেদন

এই মহান মানুষটি তাঁর নিজ গ্রাম সোনাইমুড়ীতে বিশ শয্যাবিশিষ্ট একটি মেডিকেল সেন্টার নির্মাণ করে গেছেন। গ্রামের দরিদ্র মানুষ যেন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই তিনি এটি গড়েছিলেন। কিন্তু সেই মেডিকেল সেন্টারটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। তাই তাঁরই সুযোগ্য পুত্র, বর্তমান গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জনাব জাকারিয়া তাহেরের নিকট এলাকাবাসীর আন্তরিক আবেদন, পিতার এই অসম্পূর্ণ স্বপ্নটি পূরণ করুন। মেডিকেল সেন্টারটি অতি দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নিন, যাতে বরুড়ার মানুষ পিতার স্মৃতির সঙ্গে পুত্রের ভালোবাসাও অনুভব করতে পারে।

 

পিতার আদর্শে পুত্রের পথচলা

মৃত্যুকালে মরহুম এ কে এম আবু তাহের রেখে যান স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জাকারিয়া তাহের সুমন পিতার মৃত্যুর পর বরুড়ার রাজনীতির হাল ধরেন। পিতার মতোই বরুড়ার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি কুমিল্লা-৮ আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পিতার রেখে যাওয়া আদর্শ ও স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন।

 

স্মৃতিতে অমর, পথে-প্রান্তরে চিরজীবিত

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কুমিল্লার, লালমাই-বরুড়া-জগতপুর আঞ্চলিক সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে “মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের সড়ক”। প্রতিদিন এই সড়কে যত মানুষ পথ চলে, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে এই মহান মানুষটির স্মৃতি।

 

তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে আবু তাহের ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আজও বরুড়া অঞ্চলে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী। পরিচালিত হচ্ছে সুন্নতে খৎনাসহ নানা সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম। এভাবেই মৃত্যুর পরেও তিনি প্রতিদিন বেঁচে আছেন বরুড়ার মানুষের জীবনে।

 

বিদায়ের দিনটির কথা আজও মনে পড়ে

২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪। সংসদ সদস্য পদে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মাত্র ৭২ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন বরুড়ার এই প্রিয় মানুষটি। সেদিনের শোকের কথা যারা দেখেছেন, তারা আজও বলেন, সেদিন বরুড়া কেঁদেছিল। মাঠ কেঁদেছিল। ঘর কেঁদেছিল। রাস্তা কেঁদেছিল। যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের চোখের জল মুছিয়েছেন, তাঁর বিদায়ে সকলের চোখ সেদিন অঝোরে ভিজেছিল।

 

আজ তিনি সোনাইমুড়ী গ্রামের পবিত্র মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আদর্শ, তাঁর ভালোবাসা এখনও বরুড়ার প্রতিটি মানুষের বুকে কাঁপছে।

 

পরিশেষে একটি প্রার্থনা

বরুড়ার মাটি ও মানুষের ইতিহাসে মরহুম এ কে এম আবু তাহেরের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের আলো, এই মানুষগুলোর ভরসা, এই মাটির সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। তাঁকে ভোলা যায় না। ভোলা সম্ভব নয়।

 

মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে একটাই প্রার্থনা, বরুড়ার এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে, এই নিঃস্বার্থ মানুষটিকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন। তাঁর কবরকে নূরে আলোকিত করুন। আর তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে এই উম্মতের বুকে চিরজীবিত রাখুন। আমিন।

জনপ্রিয়

বাগেরহাটে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য মিছিল

আধুনিক বরুড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতীয় অর্থনীতির পথিকৃৎ, মরহুম এ কে এম আবু তাহেরের অমর স্মৃতিতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে

 

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন শুধু নিজের জন্য নয়, অনেকের জীবন আলোকিত করতে। কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতি, ভালোবাসা আর কীর্তি এতটাই গভীরে প্রোথিত থাকে যে মৃত্যুও তাঁদের মুছে দিতে পারে না। বরুড়ার সেই চিরচেনা রাস্তায় আজও যেন তাঁর পায়ের ছাপ খোঁজা যায়। সেই মেঠোপথ, সেই বিদ্যালয়ের আঙিনা, সেই মসজিদের মিনার, সেই দরিদ্র মানুষের কুঁড়েঘর, সবখানে যেন এখনও তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

 

তিনি মরহুম এ কে এম আবু তাহের। বরুড়ার গর্ব, কুমিল্লার অহংকার, বাংলাদেশের এক অবিস্মরণীয় সন্তান।

 

একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে ইতিহাসের পাতায়

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের সোনাইমুড়ী গ্রাম। সবুজে ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামটির হাজী ইমাম উদ্দিন পরিবারে আনুমানিক ১৯৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন এক অনন্য মানুষ। সেদিন কেউ জানত না, এই শিশুটি একদিন বরুড়ার মানচিত্র পাল্টে দেবেন। দেশের ব্যাংকিং খাতে আনবেন যুগান্তকারী পরিবর্তন। হাজার হাজার বেকার মানুষের মুখে ফোটাবেন জীবিকার হাসি। আর বরুড়ার প্রতিটি অলিগলিতে ছড়িয়ে দেবেন উন্নয়নের আলো।

 

সেই শিশুটিই বড় হয়ে হলেন এ কে এম আবু তাহের। একাধারে শিল্পপতি, সংসদ সদস্য, সমাজসেবক এবং অগণিত মানুষের পরম আপনজন।

 

মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সারা দেশ তখন রক্ত আর আগুনের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। সেই দুঃসময়ে এ কে এম আবু তাহের দেশমাতৃকার পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিলেন। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেন। কারাগারে সহ্য করলেন অমানবিক নির্যাতন। তবু মাথা নত করেননি একটুও। দেশকে ভালোবেসেছিলেন প্রাণের চেয়েও বেশি। এই দেশপ্রেমই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

 

গণমানুষের কণ্ঠস্বর, তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য

রাজনীতিতে তিনি এসেছিলেন মানুষের ডাকে সাড়া দিতে, ক্ষমতার মসনদে বসতে নয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মনোনয়নে কুমিল্লা-৭ বরুড়া আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। প্রতিটি নির্বাচনে বরুড়ার মানুষ তাঁকে বুকে আঁকড়ে ধরেছে। কারণ তিনি শুধু ভোটের সময় আসতেন না। বন্যায়, দুর্ভিক্ষে, বিপদে-আপদে সবসময় পাশে থাকতেন।

 

তাঁর সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়েই বরুড়াকে পৌরসভায় রূপান্তরিত করা হয়, যা ছিল এই অঞ্চলের উন্নয়নের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ নির্মাণ করে তিনি বরুড়ার গ্রামীণ জনপদকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন। বরুড়ার আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছিল একের পর এক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ আর এতিমখানা। অহংকারহীন, সহজ-সরল এই মানুষটির দরজা সবসময় খোলা থাকত সাধারণ মানুষের জন্য। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কাছে তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত অভিভাবক।

 

দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব, ন্যাশনাল ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টা

এ কে এম আবু তাহের শুধু বরুড়ার নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সারা বাংলাদেশের একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, স্পন্সর ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যান। এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, তা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 

এর পাশাপাশি তিনি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওরিয়ন লিমিটেড, বেকো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, জিতা গার্মেন্টস লিমিটেড, পূর্বাচল ড্রিলার্স লিমিটেড, ইউনিভার্সাল মেশিনারি প্রাইভেট লিমিটেড, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স এবং মোহাম্মদ বশির এন্ড কোং-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য অঙ্গনে তিনি রেখে গেছেন অমোচনীয় ছাপ।

 

শিল্পপতি হিসেবে তিনি হাজার হাজার বেকার তরুণের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কর্মসংস্থানের সুযোগ। বরুড়ার অনেক পরিবার আজও তাঁর দেওয়া জীবিকার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে চোখের জল মোছে।

 

হাতে গড়া মেডিকেল সেন্টার, একটি অপূর্ণ স্বপ্নের আবেদন

এই মহান মানুষটি তাঁর নিজ গ্রাম সোনাইমুড়ীতে বিশ শয্যাবিশিষ্ট একটি মেডিকেল সেন্টার নির্মাণ করে গেছেন। গ্রামের দরিদ্র মানুষ যেন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই তিনি এটি গড়েছিলেন। কিন্তু সেই মেডিকেল সেন্টারটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। তাই তাঁরই সুযোগ্য পুত্র, বর্তমান গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জনাব জাকারিয়া তাহেরের নিকট এলাকাবাসীর আন্তরিক আবেদন, পিতার এই অসম্পূর্ণ স্বপ্নটি পূরণ করুন। মেডিকেল সেন্টারটি অতি দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নিন, যাতে বরুড়ার মানুষ পিতার স্মৃতির সঙ্গে পুত্রের ভালোবাসাও অনুভব করতে পারে।

 

পিতার আদর্শে পুত্রের পথচলা

মৃত্যুকালে মরহুম এ কে এম আবু তাহের রেখে যান স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জাকারিয়া তাহের সুমন পিতার মৃত্যুর পর বরুড়ার রাজনীতির হাল ধরেন। পিতার মতোই বরুড়ার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি কুমিল্লা-৮ আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পিতার রেখে যাওয়া আদর্শ ও স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন।

 

স্মৃতিতে অমর, পথে-প্রান্তরে চিরজীবিত

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কুমিল্লার, লালমাই-বরুড়া-জগতপুর আঞ্চলিক সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে “মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের সড়ক”। প্রতিদিন এই সড়কে যত মানুষ পথ চলে, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে এই মহান মানুষটির স্মৃতি।

 

তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে আবু তাহের ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আজও বরুড়া অঞ্চলে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী। পরিচালিত হচ্ছে সুন্নতে খৎনাসহ নানা সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম। এভাবেই মৃত্যুর পরেও তিনি প্রতিদিন বেঁচে আছেন বরুড়ার মানুষের জীবনে।

 

বিদায়ের দিনটির কথা আজও মনে পড়ে

২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪। সংসদ সদস্য পদে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মাত্র ৭২ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন বরুড়ার এই প্রিয় মানুষটি। সেদিনের শোকের কথা যারা দেখেছেন, তারা আজও বলেন, সেদিন বরুড়া কেঁদেছিল। মাঠ কেঁদেছিল। ঘর কেঁদেছিল। রাস্তা কেঁদেছিল। যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের চোখের জল মুছিয়েছেন, তাঁর বিদায়ে সকলের চোখ সেদিন অঝোরে ভিজেছিল।

 

আজ তিনি সোনাইমুড়ী গ্রামের পবিত্র মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আদর্শ, তাঁর ভালোবাসা এখনও বরুড়ার প্রতিটি মানুষের বুকে কাঁপছে।

 

পরিশেষে একটি প্রার্থনা

বরুড়ার মাটি ও মানুষের ইতিহাসে মরহুম এ কে এম আবু তাহেরের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের আলো, এই মানুষগুলোর ভরসা, এই মাটির সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। তাঁকে ভোলা যায় না। ভোলা সম্ভব নয়।

 

মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে একটাই প্রার্থনা, বরুড়ার এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে, এই নিঃস্বার্থ মানুষটিকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন। তাঁর কবরকে নূরে আলোকিত করুন। আর তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে এই উম্মতের বুকে চিরজীবিত রাখুন। আমিন।