সংগৃহীত ছবি
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বেলা পৌনে দুইটার দিকে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয় তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০। সংবিধান অনুসারে, জাতীয় সংসদে দলগুলোর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংখ্যার অনুপাতে নারী আসন বণ্টন করা হয়। বিএনপির মনোনয়নে এবার ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন।
গত ৩০ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের গেজেট হয়। আর ৩ মে তাঁরা শপথ নেন। এ হিসাবে পাঁচ মাসের মধ্যে সংসদ সদস্য পদ ছাড়লেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল বুধবার রাতে ফেরদৌসীকে পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে দল থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এরপর আজ বেলা পৌনে দুইটার দিকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখনই আলোচনায় আসে যে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
তবে স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে ফেরদৌসী আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে স্পিকার ডেকেছেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি।’ পদত্যাগের প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, তদন্ত হোক। পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির সিদ্ধান্ত যেটা হবে, তা হবে।’
বিএনপি ও সরকারের সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাড্ডার ঘটনা নিয়ে সরকারও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দুই দিন ধরে ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। হামলা ও ভাঙচুরে কারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নেপথ্যে কারা ভূমিকা রেখেছেন, এসব বিষয়ে তথ্য নিয়েছেন। তদন্তে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও পদত্যাগের প্রেক্ষাপট
গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র’ (মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র)-এ দুই শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রবেশ করে। মুহূর্তের মধ্যে কেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়।
ঘটনার পরপরই এই ন্যক্কারজনক হামলায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নাম উঠে আসে, যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ২০০৪ সালে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি ওই সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে করা আবেদনেও মিষ্টির নাম ছিল।
ঘটনার পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাসহ রাজনৈতিক মহলে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় শীর্ষ নেতৃত্বকে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় মিষ্টিকে তার সংসদীয় আসন ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।
দায় অস্বীকার করলেও সম্পর্ক স্বীকার
হামলা ও লুটপাটের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তবে ২০০৬ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে উক্ত সমিতির সভাপতি থাকা এবং জমির বরাদ্দের আবেদন করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তার দাবি, বর্তমানে সেই সমিতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
রাজনৈতিক পরিচিতি ও পারিবারিক পটভূমি
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তিনি বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
পারিবারিকভাবে রাজনীতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে মিষ্টির:
ভাই: তিনি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন।
স্বামী: তার প্রয়াত স্বামী সাঈদুর রহমান নিউটন ছিলেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা (২০০২ সালে নিহত)।
রাজনৈতিক সূচনা: বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে পড়ার সময় ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন এবং কলেজের এজিএস নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর এবং ২০১৯ সালে উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত নির্দেশনা আসায় আগামী রোববারের মধ্যেই স্পিকারের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া নিশ্চিত বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

বিশেষ প্রতিনিধিঃ 








