ঢাকা , সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
টেকনাফ রাজারছড়ায় যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান: গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো মানব পাচারকারীদের ২০টি আস্তানা টেকনাফে নাফ নদীতে বিজিবির চিরুনি অভিযান খেলাধুলায় তরুণদের সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী করা সম্ভব: এমপি জুই আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ: রিট খারিজ করলেন হাইকোর্ট পিরোজপুরে ৪০০ ইয়াবা ও ৩০ গ্রাম আইসসহ গ্রেপ্তার ১ রামপালের এক ইউনিট বন্ধ, উৎপাদন নেমেছে ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে বিদ্যুতের পুঞ্জীভূত সংকটে শুধু মন্ত্রীকে দোষারোপ কতটা যৌক্তিক? মোরেলগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পিরোজপুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু টেকনাফের নাজির হোসেন হত্যার আসামি রিদোয়ান গ্রেপ্তার

এফএ থেকে সিইও: একটি বীমা দাবির চেক যেভাবে বদলে দিল মো. কাজিম উদ্দিনের জীবন

 

কখনও কখনও একটি ঘটনাই একজন মানুষের পুরো জীবনদর্শন বদলে দেয়। এমনই এক বাস্তব গল্পের নায়ক ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাজিম উদ্দিন। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরেছিল একটি বীমা দাবির চেক হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে—যে অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন সফল করপোরেট নির্বাহীই নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

১৯৮৭ সালের কথা। চট্টগ্রামের এক সাধারণ তরুণ মো. কাজিম উদ্দিনের স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের পরিক্রমায় চিকিৎসা পেশায় নয়, তিনি যোগ দেন ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্সে একজন ফিল্ড অ্যাসোসিয়েট (এফএ) হিসেবে।

 

পেশাজীবনের শুরুতেই তাঁর প্রথম গ্রাহক ছিলেন নাসির উদ্দিন নামের এক কাঠমিস্ত্রি। দৈনিক আয় ছিল মাত্র ৫০ টাকা। বৃদ্ধ মা এবং ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে ছিল তাঁর সংগ্রামী সংসার। সীমিত আয়ের মধ্যেও পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি একটি জীবনবীমা পলিসি গ্রহণ করেন।

 

কিন্তু ভাগ্য ছিল নির্মম। পলিসি নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নাসির উদ্দিন।

 

তরুণ কাজিম উদ্দিন তখন উদ্বেগে ছিলেন—পরিবারটি কি আদৌ বীমার অর্থ পাবে? প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও তদন্ত শেষে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই নাসির উদ্দিনের মায়ের হাতে ৪০ হাজার টাকার বীমা দাবির চেক তুলে দেওয়া হয়।

 

সেই মুহূর্তটি আজও তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। একজন অসহায় মায়ের চোখের কৃতজ্ঞতা এবং একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুভূতি তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। পরে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একজন ডাক্তার হয়েও হয়তো এভাবে একটি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারতাম না।”

 

এই একটি ঘটনাই বদলে দেয় তাঁর পেশাজীবনের দর্শন। তিনি উপলব্ধি করেন, জীবনবীমা শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি মানুষের দুঃসময়ের নির্ভরতা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক।

 

সেই উপলব্ধিকে পাথেয় করেই তিনি ধাপে ধাপে এগিয়ে যান। একজন সাধারণ এফএ থেকে নিজের যোগ্যতা, সততা, পরিশ্রম এবং নেতৃত্বের গুণে পৌঁছে যান ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্সের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদ—মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে।

 

তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি অর্জন করে একের পর এক সাফল্য। বিশেষ করে ২০২০ সালে, বৈশ্বিক করোনা মহামারির কঠিন সময়েও ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। যে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার পরিমাণ একসময় ছিল প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা, তা পরবর্তী সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২,১০০ কোটি টাকায়। পাশাপাশি ট্রিপল-এ ক্রেডিট রেটিং, সাফা গোল্ড অ্যাওয়ার্ড এবং সেরা সিইও সম্মাননাসহ নানা স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যোগ করে।

 

তবে মো. কাজিম উদ্দিনের কাছে ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা পুরস্কারের চেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষের আস্থা। তাঁর বিশ্বাস, “গ্রাহকরাই আমাদের প্রাণ।” এই দর্শনই তাঁকে আজও অনুপ্রাণিত করে প্রতিটি গ্রাহকের পাশে দায়িত্বশীলভাবে দাঁড়াতে।

 

তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, সাফল্য এবং বীমা পেশা নিয়ে জীবনদর্শনের নানা অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প স্থান পেয়েছে “আমি একজন বীমা কর্মী হিসেবে গর্ববোধ করছি” গ্রন্থে। বইটি শুধু একজন সফল নির্বাহীর আত্মকথন নয়; এটি নতুন প্রজন্মের বীমাকর্মীদের জন্য প্রেরণার উৎস এবং মানুষের জীবনে বীমার প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধির এক মূল্যবান দলিল।

 

মো. কাজিম উদ্দিনের জীবনগল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের সাফল্য শুধু পদ, পুরস্কার কিংবা আর্থিক অর্জনে নয়; বরং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যেই একজন পেশাজীবীর প্রকৃত পরিচয় নিহিত থাকে।

জনপ্রিয়

টেকনাফ রাজারছড়ায় যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান: গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো মানব পাচারকারীদের ২০টি আস্তানা

এফএ থেকে সিইও: একটি বীমা দাবির চেক যেভাবে বদলে দিল মো. কাজিম উদ্দিনের জীবন

আপডেট : ০৪:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

 

কখনও কখনও একটি ঘটনাই একজন মানুষের পুরো জীবনদর্শন বদলে দেয়। এমনই এক বাস্তব গল্পের নায়ক ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাজিম উদ্দিন। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরেছিল একটি বীমা দাবির চেক হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে—যে অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন সফল করপোরেট নির্বাহীই নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

১৯৮৭ সালের কথা। চট্টগ্রামের এক সাধারণ তরুণ মো. কাজিম উদ্দিনের স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের পরিক্রমায় চিকিৎসা পেশায় নয়, তিনি যোগ দেন ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্সে একজন ফিল্ড অ্যাসোসিয়েট (এফএ) হিসেবে।

 

পেশাজীবনের শুরুতেই তাঁর প্রথম গ্রাহক ছিলেন নাসির উদ্দিন নামের এক কাঠমিস্ত্রি। দৈনিক আয় ছিল মাত্র ৫০ টাকা। বৃদ্ধ মা এবং ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে ছিল তাঁর সংগ্রামী সংসার। সীমিত আয়ের মধ্যেও পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি একটি জীবনবীমা পলিসি গ্রহণ করেন।

 

কিন্তু ভাগ্য ছিল নির্মম। পলিসি নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নাসির উদ্দিন।

 

তরুণ কাজিম উদ্দিন তখন উদ্বেগে ছিলেন—পরিবারটি কি আদৌ বীমার অর্থ পাবে? প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও তদন্ত শেষে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই নাসির উদ্দিনের মায়ের হাতে ৪০ হাজার টাকার বীমা দাবির চেক তুলে দেওয়া হয়।

 

সেই মুহূর্তটি আজও তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। একজন অসহায় মায়ের চোখের কৃতজ্ঞতা এবং একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুভূতি তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। পরে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একজন ডাক্তার হয়েও হয়তো এভাবে একটি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারতাম না।”

 

এই একটি ঘটনাই বদলে দেয় তাঁর পেশাজীবনের দর্শন। তিনি উপলব্ধি করেন, জীবনবীমা শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি মানুষের দুঃসময়ের নির্ভরতা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক।

 

সেই উপলব্ধিকে পাথেয় করেই তিনি ধাপে ধাপে এগিয়ে যান। একজন সাধারণ এফএ থেকে নিজের যোগ্যতা, সততা, পরিশ্রম এবং নেতৃত্বের গুণে পৌঁছে যান ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্সের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদ—মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে।

 

তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি অর্জন করে একের পর এক সাফল্য। বিশেষ করে ২০২০ সালে, বৈশ্বিক করোনা মহামারির কঠিন সময়েও ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। যে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার পরিমাণ একসময় ছিল প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা, তা পরবর্তী সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২,১০০ কোটি টাকায়। পাশাপাশি ট্রিপল-এ ক্রেডিট রেটিং, সাফা গোল্ড অ্যাওয়ার্ড এবং সেরা সিইও সম্মাননাসহ নানা স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যোগ করে।

 

তবে মো. কাজিম উদ্দিনের কাছে ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা পুরস্কারের চেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষের আস্থা। তাঁর বিশ্বাস, “গ্রাহকরাই আমাদের প্রাণ।” এই দর্শনই তাঁকে আজও অনুপ্রাণিত করে প্রতিটি গ্রাহকের পাশে দায়িত্বশীলভাবে দাঁড়াতে।

 

তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, সাফল্য এবং বীমা পেশা নিয়ে জীবনদর্শনের নানা অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প স্থান পেয়েছে “আমি একজন বীমা কর্মী হিসেবে গর্ববোধ করছি” গ্রন্থে। বইটি শুধু একজন সফল নির্বাহীর আত্মকথন নয়; এটি নতুন প্রজন্মের বীমাকর্মীদের জন্য প্রেরণার উৎস এবং মানুষের জীবনে বীমার প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধির এক মূল্যবান দলিল।

 

মো. কাজিম উদ্দিনের জীবনগল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের সাফল্য শুধু পদ, পুরস্কার কিংবা আর্থিক অর্জনে নয়; বরং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যেই একজন পেশাজীবীর প্রকৃত পরিচয় নিহিত থাকে।