পিরোজপুরে সুপারির আবাদ ও বাণিজ্য বিস্তৃত হলেও এবার প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলন পাচ্ছেন না চাষিরা। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত বছরের তুলনায় সুপারির উৎপাদন কমেছে বলে জানিয়েছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে বেড়েছে কাঁচা সুপারির দাম। তবে বাড়তি দামেও উৎপাদন কমে যাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারছেন না অনেক চাষি। এতে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসল সুপারি চাষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকায় সুপারিবাগান ঘিরে গড়ে উঠেছে কৃষি ও ব্যবসার বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। জেলার কাউখালী, ভান্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া, নেছারাবাদ, জিয়ানগর ও সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সুপারির উৎপাদন হয়। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব সুপারি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। সুপারির আকার ও মানের কারণে পিরোজপুরের উৎপাদিত সুপারির বিশেষ চাহিদাও রয়েছে।
কাউখালীর হাটে কোটি টাকার বেচাকেনা
ভোরের আলো ফুটতেই কাউখালীর সুপারির হাটে শুরু হয় ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা। সুপারি বাছাই, দর-কষাকষি, বস্তাবন্দী ও পরিবহনের কাজে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো বাজার। সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার বসা এ হাটে প্রতি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ সুপারি কেনাবেচা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পিরোজপুরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও ঝালকাঠি থেকে চাষি ও ব্যবসায়ীরা এখানে সুপারি নিয়ে আসেন। পাশের বাগেরহাট জেলার কচুয়া এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সুপারিও এ অঞ্চলের বাজারগুলোতে কেনাবেচা হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সুপারি পাঠানো হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এ হাটকে কেন্দ্র করে সুপারি বাছাই, পরিবহন, কেনাবেচা ও সংরক্ষণের কাজে যুক্ত রয়েছেন বহু মানুষ। মৌসুমি এ ব্যবসা স্থানীয় কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীদের আয়ের অন্যতম উৎস।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাউখালীর হাটে ২১ ঘা বা ২১০টি কাঁচা সুপারি নিয়ে এক কুড়ির হিসাব করা হয়। আকার ও মানভেদে বর্তমানে প্রতি কুড়ি কাঁচা সুপারি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট আকারের সুপারি এর চেয়ে কম দামেও বিক্রি হচ্ছে। শুকনো সুপারি প্রতি মণ, অর্থাৎ ৪০ কেজি, ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তবে বাজারদর প্রতিদিনের সরবরাহ, আকার ও মান অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
একসময় পিরোজপুর সদর উপজেলার চলিশা বাজারে দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদিত সুপারির বড় অংশ কেনাবেচা হতো। বর্তমানে কাউখালীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার হাটেও সুপারির বাণিজ্য বিস্তৃত হয়েছে। সুপারির দাম বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও ফলন কমে যাওয়ায় সেই সুবিধা পাচ্ছেন না অনেক চাষি। তাঁদের ভাষ্য, একই বাগান থেকে গত বছরের তুলনায় এবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম সুপারি পাওয়া যাচ্ছে। চাষি আবু জাফর বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার সুপারির ফলন কম হয়েছে। তবে দাম ভালো পাচ্ছেন। আগামী বছর ফলন বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা ইউনিয়নের পোরগোরা এলাকার কৃষক মো. আবুল সরদার বলেন, বাজারে সুপারির সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। ফলন ভালো হলে আয় আরও বেশি হতো।
চাষি মোতালেব হাওলাদার বলেন, গত বছর যে বাগানের সুপারি দুই লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, এবার সেই বাগান থেকে এক লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়েই শঙ্কা রয়েছে। ফলন কমে যাওয়ায় এবার তাঁর লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরবরাহ কম, ব্যবসায়ও অনিশ্চয়তা। কাউখালীর হাটের ব্যবসায়ী ফোরকান হাওলাদার বলেন, গত বছর এ সময়ে প্রতি কুড়ি কাঁচা সুপারি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার তা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় উঠেছে। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।
তবে দাম বাড়লেই যে ব্যবসায়ীদের লাভ বাড়ছে, তা নয়। জিয়ানগরের সুপারি ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, তাঁরা ট্রাকে করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সুপারি পাঠান। এবার উৎপাদন কম হওয়ায় বেশি দামে সুপারি কিনতে হচ্ছে। ফলে সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসাও প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না।
মৌসুমে কাঁচা সুপারি কিনে সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করেন অনেক ব্যবসায়ী। নেছারাবাদ উপজেলার ব্যবসায়ী ফয়সাল হোসাইন জানান, তিনি মাটির নিচে পলিথিন বিছিয়ে সুপারি সংরক্ষণ করেন। প্রায় ছয় মাস পর বাজারে কাঁচা সুপারির সরবরাহ কমে এলে সেগুলো বিক্রি করেন। এভাবে সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ভালো দাম পাওয়ার আশা করেন তিনি।
কাউখালীর বাজারের ইজারাদার রফিকুল ইসলাম বলেন, এটি শত বছরের পুরোনো বাজার। পিরোজপুরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও ঝালকাঠি থেকে মানুষ এখানে সুপারি বিক্রি করতে আসেন। বাজারের খাজনা তুলনামূলক কম হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়ছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার নিয়মিত হাট বসবে বলে জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পিরোজপুরে ৪ হাজার ৬৬৯ হেক্টর জমিতে সুপারির আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রার উৎপাদনের আনুমানিক বাজারমূল্য ৮৪০ থেকে ৯৩০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বাজারমূল্যের হিসাবের ভিত্তি ও বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পিরোজপুর সদর, কাউখালী ও নেছারাবাদসহ জেলার সাত উপজেলায় গত বছরের তুলনায় এবার সুপারির ফলন কম হয়েছে। তবে উপজেলা-ভিত্তিক উৎপাদনের তুলনামূলক পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে ফলন কমার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, এবার পিরোজপুরে সুপারির ফলন কম হয়েছে। অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় সুপারি লাভজনক হওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠছে। ফলন কম হওয়ায় বাজারে চাষিরা তুলনামূলক বেশি দাম পাচ্ছেন। সুপারি চাষে নিয়মিত পরিচর্যা ও উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে কৃষি বিভাগ চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছে এবং সহযোগিতা করছে।
উৎপাদন ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
পিরোজপুরে সুপারির আবাদ, বিপণন ও সংরক্ষণকে ঘিরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। এ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক, পাইকারি ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা। তাই ফলন কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু কৃষকের আয়েই নয়, স্থানীয় বাজার ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
উৎপাদন কমার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে আবহাওয়া, গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই, পরাগায়ন ও মাটির অবস্থা সম্পর্কে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদন ও বাজারদরের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করা গেলে চাষি ও ব্যবসায়ীরা আগাম পরিকল্পনা করতে পারবেন।
সুপারির আবাদ বাড়লেও উৎপাদন ধরে রাখা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে এ সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তাই ফলন কমার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পরামর্শ, উন্নত বাগান ব্যবস্থাপনা এবং বাজারব্যবস্থার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া জরুরি।

হাসান মামুন, দক্ষিণাঞ্চল প্রতিনিধিঃ 



















