কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবায়নাধীন সরকারি টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকা ও ঢাকনা তৈরি এবং দায়িত্বশীলদের তদারকির ঘাটতির কারণে প্রকল্পটির গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে উপজেলার হ্নীলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সরকারি টয়লেটের চাকা ও ঢাকনা তৈরির কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই দিন আগে কাজ শুরু হয়েছে। তবে নির্মাণকাজে বালুর পরিবর্তে পাহাড়ি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিম্নমানের কংকর ও অপর্যাপ্ত সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে চাকা ও ঢাকনা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিয়ম অনুযায়ী জিআই তার বা লোহার ফ্রেম ব্যবহার না করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে চাকা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কাজে নিয়োজিত রোহিঙ্গা রাজমিস্ত্রি আবুল বশর জানান,“ফ্রেম তৈরি করে ঢালাই করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। তাই নিচে, মাঝখানে ও উপরে কয়েকটি লোহা বসিয়ে কাজ করছি। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য এভাবেই করা হচ্ছে।”
কর্মস্থলের পাশে রাখা দুটি জিআই তারের ফ্রেম দেখিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,“ওগুলো শুধু স্যাম্পল দেখানোর জন্য রাখা হয়েছে।”
এদিকে কংকর মিক্সারে নিয়োজিত রোহিঙ্গা শ্রমিক মাহমুদ উল্লাহ চাকা তৈরির মিশ্রণের অনুপাত সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি। পরে দেখা যায়, মিক্সারে বালুর পরিবর্তে পাশে স্তুপ করে রাখা পাহাড়ি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“এগুলো শেষ হয়ে গেলে ভালো বালি আনা হবে।”
আরেক রোহিঙ্গা শ্রমিক রশিদুল্লাহ বলেন,“আমরা যেভাবে নির্দেশনা পাই, সেভাবেই কাজ করি। ঠিকাদার যেসব সামগ্রী দেন, তাই দিয়েই তৈরি করছি।”
ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের পরিচয় নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। রাজমিস্ত্রি আবুল বশর জানান, জাহাঙ্গীর নামের এক হেড মিস্ত্রি কাজ তদারকি করছেন। পরে জাহাঙ্গীর বলেন, তিনি কেবল জিয়াবুল নামের একজন সাইট পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
সাইট পরিচালক জিয়াবুল জানান, কাজ সাব-কন্ট্রাক্টে দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি হোয়াইক্যং কাঞ্জরপাড়া এলাকার ফরিদ নামের এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি টয়লেটের চাকা ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করছেন বলে জানান।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফরিদ অভিযোগের বিষয়ে তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে বলেন,“মিস্ত্রিরা হয়তো ভুল করছে।”
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর টেকনাফ উপজেলা কর্মকর্তা মো. ফারুক হোসাইন বলেন,
“আমাদের লোকজন কাজ পরিদর্শন করেছেন। যথাযথ নিয়মেই কাজ করতে হবে। জিআই বা লোহার ফ্রেম ছাড়া চাকা তৈরির সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন,“ফরিদ নামে কেউ আমাদের ঠিকাদার নন। রণিই মূল ঠিকাদার।”
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. নছরুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক-এর অর্থায়নে টেকনাফে এক হাজার টয়লেট নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সুবিধাভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮ হাজার চাকা ও ২ হাজার ঢাকনা তৈরির কাজ চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত কাজ শেষ করার তাড়নায় নির্মাণকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছে। এতে প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও গুণগতমান নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুবিধাভোগীরা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

ফরহাদ রহমান, টেকনাফ প্রতিনিধিঃ 



















