যে মাটিতে একদিন কুমার নদীর কলস্বর মিশে গিয়েছিল শালবনের পাখির ডাকে, যে মাটি লালন করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক অনন্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি সেই কুমিল্লার দামাল সন্তানেরা এবার ঢাকার বুকে রচনা করল এক নতুন ইতিহাস। নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বুকের গভীরে আঁকড়ে ধরে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল ২০২৬) রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী হোটেল সোনারগাঁওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করল “কুমিল্লা ডিভিশনাল ক্লাব”।
সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়া এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কবি, শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী, সমাজসেবী ও বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা একত্রিত হন। একটি সংগঠনের জন্মের চেয়েও বড় কথা সেদিন যেন একটি আবেগের পুনর্মিলন ঘটল। দীর্ঘদিন রাজধানীর ইট-পাথরের মাঝে বাস করতে করতে যে মানুষগুলো মনের গভীরে লালন করে চলেছিলেন নিজের জেলার স্মৃতি ও গন্ধ, তাঁরা সেদিন খুঁজে পেলেন একটি অভিন্ন আশ্রয়।
নেতৃত্বে যারা
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কবি, সমাজবিজ্ঞানী ও শিকড়সন্ধানী মু. নজরুল ইসলাম তামিজী। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ২১ সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। আহ্বায়কের দায়িত্বভার অর্পিত হয় স্বয়ং মু. নজরুল ইসলাম তামিজীর ওপর এবং সদস্যসচিব মনোনীত হন ড. ফোরকান উদ্দীন।
যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান হাজী মো. জিয়াউদ্দিন, কবি মু. আবু তাহের, প্রকৌশলী মো. রাহাদ উজ্জামান ও ড. আবদুল আলীম। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যক্ষ সালাউদ্দিন ভূইয়া, প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন, আলহাজ্ব মো. বিল্লাল হোসেন, অধ্যাপক নায়লা ইসলাম, মাহমুদুল হক মজুমদার, কামরুজ্জামান জনি, প্রকৌশলী সফিউল আযম, মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, কবি বাপ্পী সাহা, কবি তাহেরা খাতুন ও মিজানুর রহমান মিজান প্রমুখ। সমন্বয়কারীর দায়িত্বে থাকবেন কবি রলি আক্তার, কবি আর মুজিব ও কবি সাইফ সাদী।
তামিজীর উদাত্ত আহ্বান
সভাপতির বক্তব্যে মু. নজরুল ইসলাম তামিজী অত্যন্ত প্রাণস্পর্শী ভাষায় বলেন, “কুমিল্লা ডিভিশনাল ক্লাব কেবল একটি সংগঠন নয় — এটি হবে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষ তাদের শিকড়, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে লালন ও বিকশিত করতে পারবেন।”
তাঁর এই কথাগুলো যেন কেবল বক্তৃতার ভাষা ছিল না — ছিল একটি প্রজন্মের সামষ্টিক অনুভবের প্রতিধ্বনি। উপস্থিত সকলের চোখে-মুখে তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল এক নতুন প্রতিজ্ঞার আলো।
অনুষ্ঠানে বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন, এই ক্লাব হবে কুমিল্লা বিভাগের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সামাজিক উন্নয়নের এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় তরুণ প্রজন্মের প্রসঙ্গে। নগর-জীবনের ঘূর্ণিপাকে যে তরুণ প্রজন্ম ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি থেকে, এই ক্লাব তাদের পুনরায় নিজের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে এমন দৃঢ় প্রত্যয় উচ্চারিত হয় সভায়।
রাতের নামাজের আজানের সুর যখন ঢাকার আকাশে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন হোটেল সোনারগাঁওয়ের সভাকক্ষে বিরাজ করছিল এক অনন্য উষ্ণতা। উপস্থিত অতিথিরা পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানালেন, কুশল বিনিময় করলেন যেন অনেকদিন পরে হারানো স্বজনদের পুনর্মিলন হলো এক ছাদের নিচে।
“কুমিল্লা ডিভিশনাল ক্লাব” এই নামটি আজ থেকে কেবল একটি সংগঠনের পরিচয় নয়, এটি হয়ে উঠল লক্ষ কুমিল্লাবাসীর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও গৌরবের এক জীবন্ত প্রতীক। মেঘনার স্রোতের মতোই এই সংগঠন এগিয়ে যাবে অদম্য, অবিরাম এবং অপ্রতিরোধ্য।

মোঃ আনজার শাহ 



















